Home / প্রিয় লোহাগাড়া / উপজেলার প্রাচীন জনপদঃ

উপজেলার প্রাচীন জনপদঃ

গৌড়স্থানঃ

১৪৩৯ সালে বাংলার সুলতান সদাকত খাঁ নামক সেনাপতির নেতৃত্বে বিশাল গৌড়বাহিনী আরকান রাজ্য পুনঃদখল করে নরমিখালকে আরকানের রাজা হিসেবে বসিয়ে দেন। তখন থেকে নরমিখাল আরকান রাজ্য শাসন করেন। জনশ্রুতি আছে, আরকান বিজয়ের পর গৌড়বাহিনী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার গৌড়স্থান নামক স্থানে দূর্গ গড়ে তুলেন।

গৌড়বাহিনীর এই দূর্গের নামানুসারে এই এলাকার নাম গৌড়স্থান নামকরন হয় বলে ধারণা করা হয়।

রাজঘাটাঃ

আমিরাবাদ ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম রাজঘাটা। এলাকার পাশ দিয়ে চলে গেছে টংকাবতী খাল। এলাকার লোকজনের মতে, আরকান রাজা নমরিখলা রাজার ঘাটা(যাতায়াতের পথ) ছিল এটি। আরকান রাজা তাঁর বাহিনী নিয়ে এ ঘাটা দিয়ে গৌড়স্থানে গিয়েছিল বলে এর নামকরণ করা হয় রাজঘাটা।

সুখছড়ীঃ

লোহাগাড়া উপজেলার এক অনাবিল প্রাকৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধ গ্রামের নাম সুখছড়ী। গ্রামের বুকে টংকাবতী খালের ৩টি ছড়া পতিত রয়েছে। যা বছরের অধিকাংশ সময় শুকনো থাকে। এ শুখনো ছড়াগুলোর নামানুসারে সুখছড়ী নামকরণ হয় বলে ধারণা করা হয়। অন্য জনশ্রুতি মতে, সুখ শব্দের অর্থ সমৃদ্ধি বা শান্তি আর ছড়ি শব্দের অর্থ লাঠি বা দন্ড। প্রাচীনকাল থেকে এ গ্রামের মানুষ এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আদেশ, উপদেশ, শাসন মেনে চলার প্রবণতায় বেড়ে ওঠেছে। আজ পর্যন্ত সেই শান্তি বজায় আছে। এই গ্রামে ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২টি মাদ্রাসা, ১৫টি মসজিদ ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রাচীনতম হিন্দু সম্প্রদায়ের কালি মন্দির। এ জনপদে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে রয়েছেন- এনবিআর এর সাবেক সদস্য সম্ভুনাথ দাশ, বুয়েটের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চ্যান্সেলর ড. দীপক দাশ, বাংলা একাডেমীর সাবেক উপ-পরিচালক তপন চক্রবর্তী, সাবেক সিনিয়র ফরেস্ট রিসার্চ অফিসার আফজালুর রহমান, জনতা ব্যাংকের সাবেক জি.এম. মরহুম আনোয়ারসহ বহু কৃতি সন্তানেরা। সুফী সাধকের মধ্যে রয়েছেন আঠারো শতকের শুরুর দিকের অলিকুল শিরোমণি আলেমেদ্বীন সৈয়দ মো: মোফাদ্দলুর রহমান।

এই জনপদের আরেক নিদর্শন কামার দিঘী, শাহ সূজার আমলে অন্য অঞ্চল থেকে এ এলাকায় কামার গোষ্ঠী এসে বসতি স্থাপন করছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। মোঘল আমলের কামার দিঘী এখনো কালের সাক্ষী হয়ে স্মৃতি বহন করছে।

হাজারবিঘাঃ

লোহাগাড়া থানার বহুল পরিচিত একটি গ্রাম হাজারবিঘা। মোর্তজা খাঁর নেতৃত্বে মোঘল বাহিনী চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের রামু পর্যন্ত গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা না পেয়ে ফেরত আসে এবং শঙ্ক নদীর উত্তরর তীরে অবস্থান নেয়। আধু খাঁ ও লক্ষণসিংহ নামের দুজন হাজারী সেনাপতি সেখানকার সীমান্তের দায়িত্ব পান। আধু খাঁকে শঙ্ক নদীর দক্ষিণ এলাকা সাতকানিয়া, লোহাহাড়া, বাঁশখালীসহ চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। হাজারী সেনাপতী আধু কাঁ এ এলাকার বিঘাবিঘা জায়গা  বনজঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন ও আবাদের উপযোগী করার জন্য এ এলাকার নাম হাজারবিঘা করা হয় বলে ধারণা করা হয়।

উজিরভিটাঃ

লোহাগাড়া সদরের একটি গ্রাম উজিরভিটা। শায়েস্তা খানের পুত্র বুজর্গ উমেদ খান চট্টগ্রাম বিজয়ের সময় প্রধান সেনাপতি ছিলেন। ওই সময়ে মোহাম্মদ খাঁ নামে এক নায়েবে উজির ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে উজিরভিটা আসেন। এই নায়েবে উজিরের নামানুসারে এলাকার নাম উজিরভিটা হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

কিল্লার আন্দরঃ

উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের একটি গ্রাম কিল্লার আন্দর। বাংলার সুলতান সদাকত খাঁ সেনাপতির নেতৃত্বে বিশাল গৌড় বাহিনী দ্বারা আরকান রাজ্য পুন:দখল করে নরমিখলাকে আরকানের রাজার আসনে বসান। আরকান বিজয়ের পর গৌড় বাহিনী লোহাগাড়ার কিল্লার আন্দর স্থানে দূর্গ স্থাপন করেন। এই এলাকায় পুকুর দিঘী খনন করেন। তখন থেকে এলাকাটির নামকরণ হয় কিল্লার আন্দর। এরকম জনশ্রুতি রয়েছে।

নারিশ্চাঃ

উপজেলার চুনতী ইউনিয়নের সুন্দর একটি গ্রামের নাম নারিশ্চা। গ্রামটির দক্ষিণ পাশে সারি সারি পাহাড়ের স্বচ্ছ সলিল ঝিরি উত্তর দিকে প্রবাহিত। এই স্রোতধারা আঁকাবাঁকা গতিতে চলে আসে নাড়ির ছড়া বা নারিকার ছড়া নাম হয়ে। এ নারিকার ছড়া হতে নারিশ্চা নামের উৎপত্তি পলে ধারণা করা হয়। নারিয়ার ছড়া ও ডলু খালের মিলনস্থলে গড়ে ওঠে নারিশ্চা গ্রাম।

ইয়াসিন পাড়াঃ

উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নে মোঘল আমলে ইয়াসিন নামের একজন ইসলাম ধর্ম প্রচারক আসেন। তিনি এখানে বসতি স্থাপন করে ধর্ম প্রচার-প্রসার করেন। এজন্য তার নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ করা হয় ইয়াসিন পাড়া।

কুশাঙ্গের পাড়া ও হাদুর পাড়াঃ

উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নে এ ঐতিহাসিক গ্রাম দুটি অবস্থিত। লোকমুখে শোনা যায়, কুশান ও হাদুই দুই মগ ধর্মাবলম্বী সহোদর ছিলেন। হাদুই ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে হাদু নাম রাখেন। কুশান বৌদ্ধ ধর্মে থেকে যান। হাদু যেখানে বসতি স্থাপন করেন তার নাম দেই হাদুর পাড়া আর যেখানে কুশান বসতি স্থাপন করেন তার নাম রাখা হয় কুশান পাড়া।

হাজীর রাস্তাঃ

সোলতানী ও মোঘল আমলে এদেশের মানুষ হজ্ব করতে সমুদ্র পথে আরব যেত। লোহাগাড়া থেকে হজ্ব করতে যাওয়ার জন্য হাজীরা হাজির রাস্তা নামক স্থানে মিলিত হত। জানা যায়, আধুনগর ও চুনতীর সংযোগস্থলে অবস্থিত এ স্থানটি ওই সময়ে সমুদ্রের মোহনা ছিল। বর্তমানে এটি কাজির ডেবা নামে পরিচিত। এই কাজির ডেবার সাথে খালের চ্যানেল ছিল। পাশে ঐতিহাসিক রাফিয়া মুড়া ও বটগাছ ছিল। রাফিয়া মুড়ায় হাজীরা মিলিত হত। কাজির ডেবা থেকে জাহাজযোগে হাজিরা হজ্বের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে রওয়ানা দিতেন। এজন্য এ এলাকাটির নামকরণ হয় হাজির রাস্তা। রাফিয়া মুড়া বর্তমানে ঈদগাহ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর বটগাছটি কালের সাক্ষী হয়ে এখনো দাড়িয়ে আছে।

মল্লিক ছোবহানঃ

লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম মল্লিক ছোবহান।

জনশ্রুতি রয়েছে,

১৬৬৬ সালের দিকে মোঘল আমলে মোহাম্মদ খাঁ এই এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন। ওই সময় তিনি এ এলাকার নামকরণ করেন মালিক ছোবহান। পরবর্তীতে এই নামকে পরিমার্জিত করে রাখা হয় মল্লিক ছোবহান।

অন্য এক জনশ্রুতি মতে, সোলতানী আমলে মুলুক ছোবহান নামে এক রাজা এলাকাটি সংস্কার করেন। তার নামানুসারে এ এলাকার নাম দেওয়া হয় মুলুক ছোবহান। পরবর্তীতে পরিমার্জিত করে এর নামকরণ হয় মল্লিক ছোবহান।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক/আরকান সড়কঃ

ঐতিহাসিকদের মতে, সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহজাদা সূজার আমলে আরকান সড়ক নির্মাণ হয়। এই আরকান সড়কটি একদিকে কক্সবাজার রামু অন্যদিকে ফেনী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, শাহ সূজার বাহিনী ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জানুয়ারী খাজুয়া প্রান্তরে আওরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুন দেয়াঙ(বর্তমানে আনোয়ারা) পৌঁছেন।

চট্টগ্রামের লোকগীতি “পরীবানুর হাওলা” তে উল্লেখ আছে, শাহ সূজা দেয়াঙ(বর্তমানে আনোয়ারা) থেকে স্থলপথে আরকানে যান। যাওয়ার পথে লোহাগাড়ার চুনতীতে অবস্থান করেছেন বলে ধারণা করা হয়।

রামুর ইতিহাস গ্রন্থের প্রনেতা গবেষক আব্দুল কাসেম বলেছেন, শাহ সূজার বিশাল মোঘলবাহিনী দেয়াঙ দু’দলে বিভক্ত হয়ে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রাপথের অগ্রগামী মোঘলবাহিনী অরণ্যপথে ২২ হাত চওড়া একটি সড়ক নির্মান করেণ। রেনেল (Renell) মানচিত্রে রামু পর্যন্ত একটি সড়ক দেখানো হয়েছে। যা আরকান সড়ক তথা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হিসেবে চিহ্নিত।

ইংরেজ ঐতিহাসিক ফিয়ারি এন্ড স্টুয়ার্ড-এর মতে, শাহ সূজা পাহাড়ি দূর্গম অতিক্রম করে নাফ নদীর তীরে পৌঁছে বিশ্রাম নেন। উপরের আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, শাহ সূজা আরকানে যাওয়ার সময় তাঁর বিশাল মোঘল বাহিনী ঝোঁপ-জঙ্গল পরিষ্কার করে সড়ক সৃষ্টি করেন। সে সড়কটি বর্তমানে আরকান সড়ক(চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক) নামে পরিচিত।

চুনতী ঈদগাহ পাহাড় ও শাহ সূজাঃ

বাংলাকে মুক্ত করার জন্য সম্রাট শাহজাহান ও তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র দারাশিকো রাজকীয় বাহিনী প্রেরণ করেন। এতে শাহ সূজা বিতাড়িত হয়ে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের দক্ষিণ পূর্বে আরকান রাজার আশ্রয়প্রার্থী হন।

চুনতীর অন্যতম পথিকৃৎ শাহ মাওলানা আবদুল হাকিম (রহ:) রচিত শজরাহমূলে জানা যায়, ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ মে শাহ সূজা নিজ পরিবারের সদস্যবর্গ, আলোম-ওলামাসহ ২০০ জন একান্ত অনুগামী এবং ৩০০০ সৈন্য-সামন্ত নিয়ে চট্টগ্রাম তথা ইসলামাবাদ হয়ে আরকান অভিমুখে যাত্রা করেন। চট্টগ্রাম হতে সাঙ্গু ও ডলু নদের দক্ষিণ প্রান্তে এসে জাহাজ চলাচল উপযোগী পানিপথ সমাপ্ত হলে চুনতীর বর্তমান কেন্দ্রীয় ঈদগাহ পাহাড় ও কবরস্থানের পাদদেশে নৌবহর নোঙ্গর করেন। তারপর তাঁরা পায়ে হেঁটে সামান্য দক্ষিণে সুপ্রশস্ত পাহাড়ে অবস্থান নেন। শাহ সূজা চারদিকে জঙ্গল ঘেরা প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য ও নিরাপদ জায়গা দেখে সেখানে আস্তানা স্থাপনের নির্দেশ দেন। এ পাহাড়টির পাদদেশে বর্তমানে চুনতী ঈদগাহ ময়দান হিসেবে পরিচিত।

আখতারাবাদঃ

লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের অন্যতম একটি গ্রামের নাম কুমিরাঘোনা। যার বর্তমান নাম আখতারাবাদ। ১৯৪০ সালের দিকে এ গ্রামের কোন গুরুত্ব ছিল না। ধানী জমির তিন দিকে পাহাড়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির সাথে বালি এসে সব ধান নষ্ট হতো। আর ধান পাকলে পাহাড় থেকে বানর এসে সব নষ্ট করে ফেলত। প্রতিনিয়ত এ গ্রামে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। এলাকাবাসী দিবা-রাত্রী কঠোর পরিশ্রম করেও ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেনি। এমন সময় কুতুবুল আলম শাহ সুফী মীর মুহাম্মদ আখতার (রহ:) কুমিরাঘোনায় ভ্রমণ করেন। তিনি অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে নিজ থেকে এলাকার দুর্দশার কথা জানতো। তাঁর এ শক্তির বদৌলতে এলাকার অবস্থার পরিবর্তনে কাজ করেন। শাহ সুফী মীর মুহাম্মদ আখতার (রহ:) এর নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ ১। লোহাগাড়া ইতিহাস ও ঐতিহ্য বই, লেখকঃ মোহাম্মদ ইলিয়াছ;
২। ইন্টারনেট।

About Tamzid20

Check Also

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন লোহাগাড়াবাসীর রক্ত-মাংসে মিশে আছে। এমন উৎসবের আয়োজনের ইসলাম ধর্মীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যের মধ্যে …

সংবাদপত্রে লোহাগাড়াঃ

অবিভক্ত লোহাগাড়া-সাতকানিয়া থাকা অবস্থায় ৯০ এর দশক থেকে এ এলাকায় মাসিক পত্রিকা বের হয়। মাসিক …

লোহাগাড়ার অন্যান্য সম্পদসমূহ

মৎস সম্পদঃ উপজেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ১৯৭০ টি। উপজেলায় মৎজীবির সংখ্যা ২৭০ জন এবং জেলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *