Home / মুক্তিযুদ্ধে লোহাগাড়ার অবদান / মহান মুক্তিযুদ্ধ ও লোহাগাড়াঃ

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও লোহাগাড়াঃ

দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম একটি উপজেলার নাম লোহাগাড়া। এলাকার মানুষের রয়েছে দেশের প্রতি অন্যরকম টান। দেশ ও মাতৃকার টানে ১৯৭১ সালে এ এলাকার দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা এবং এলাকার দেশপ্রেমিক জনতা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। দেশের এমন পরিস্থিতিতে নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতাকে এড়িয়ে এ এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে পাক বাহিনীর ও তাদের দোষরদের বিরুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ উপহার দিতে ভূমিকা রেখেছেন। দেশের এ মহান বিজয়ে লোহাগাড়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য। লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের কৃতিসন্তান শহীদ মেজর নাজমুল হক ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীনন ৭নং সেক্টরের প্রথম কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বৃহত্তর রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলায় বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে লোহাগাড়ায় পাকিস্তানি হায়নাদের হামলা হয়। লোহাগাড়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র বটতলীতে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে তারা হামলা করে। এতে সদর ইউনিয়ন লোহাগাড়ার বাঁচা মুন্সি পাড়ার আলতাফ মিয়ার ছেলে আবদুস সালাম গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায়। বিমান হামলায় পুড়ে যায় দোকানপাট। বিমান হামলার পর লোহাগাড়া পাক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আমিরাবাদের ব্রাহ্মণ ও বণিক পাড়ায় হামলা করে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। আধুনগর, চুনতী ও কলাউজানসহ বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় অগ্নিসংযোগ করে। স্মৃতি প্রকাশনা সূত্রে জানা যায়, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনার খবর লোহাগাড়ায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকার মুক্তিপাগল মানুষ স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাক বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে তাঁরা সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় ব্যারিকেড গড়ে তোলেন। ১৬ এপ্রিল শুক্রবার জুমার নামাজের পর লোহাগাড়ার বটতলী মোটর স্টেশনে দুটি জঙ্গিবিমান হামলা করে। ওই সময় প্রাণ হারায় আবদুস সালাম। পুড়ে যায় বটতলীর ১৫ টি দোকান। পাক বাহিনী ২৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার আমিরাবাদের ব্রাহ্মন পাড়া ও বণিক পাড়ায় হামলা চালিয়ে প্রায় ১৫ জনকে হত্যা করে। ৭ ডিসেম্বর পাক বাহিনী লোহাগাড়া লম্বাদিঘীর পাড় এলাকায় হামলা চালিয়ে ১জনকে হত্যা করে। ৭ ডিসেম্বর পাক বাহিনী চুনতী হিন্দু পাড়ার ১১ জনকে ধরে নিয়ে যায়। দোহাজারী নিয়ে পাক বাহিনী তাদের উপর গুলি চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করে।

১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর ছিল চুনতী অপারেশনের দিন। কক্সবাজার থেকে আসা আজিজনগর এলাকায় অবস্থানকারী পাকবাহিনী বিকেলে চট্টগ্রাম শহরে যাত্রা করবে। এ খবর শুনে মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর দলটির মোকাবেলা করার জন্য জোড়পুকুরিয়া মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে খবর দেয়। ক্যাম্পের সহযোগিতায় চুনতী অপারেশনে মুক্তিযোদ্ধারা চুনতী পুলিশ ফাঁড়ি দখল করে সেখানে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা কক্সবাজার থেকে আসা পাক বাহিনীকে ঘেরাও করে বন্দী করে। ঐদিন সকালে জোড়পুকুরিয়া মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পের কমান্ডার শামসুর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী কলাউজান ও চরম্বার কয়েকটি গ্রামে অপারেশন চালায়। পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা অন্যান্য অঞ্চলে অপারেশনসহ সর্বশেষ চুনতীতে অপারেশনের ফলে লোহাগাড়া হানাদার মুক্ত হয়। এরপর স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আনন্দ উল্লাস করেন।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর ২০১৫ সালে আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুখছড়ি গ্রামে রত্না চক্রবর্তী নামে এক বীরঙ্গনার সন্ধান পান লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসন। একই গ্রামে আরো ৫ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল খুজে পান। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে কোন একদিন তাঁরা পাক বাহিনীর হাতে হত্যার স্বীকার হন।

দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লক্ষ শহীদের মধ্যে লোহাগাড়ারও অনেক সাহসী সন্তানরা রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে লোহাগাড়ার হয়ে যারা অবদান রাখেন তারা ৯৯ জনের একটি তালিকা সরকারিভাবে ২০১৫ সালের আগষ্ট মাসে প্রকাশ করা হয়। তাঁরা হলেন- রফিক দিদার, মোজাহের মিয়া, মো: নুরুল ইসলাম, সুভাষ চন্দ্র দত্ত, আব্দুল হামিদ বেঙ্গল, মো: পেঠান, অতিন্দ্র লাল নাথ, বজেন্দ্র লাল দেবনাথ, নুরুল কবির, শ্রী পুলিন দে, কাজল কান্তি দাশ, হৃদয় মোহন নাথ, আহমদ হোসেন, শ্যামা চরণ নাথ, রাখাল কৃষ্ণ দত্ত, তপন দাশ, আবদুস ছোবহান, হাবিবুর রহমান, আবদুস শুক্কুর, মিলন চক্রবর্তী, দিনবন্ধু দেবনাথ, বাদল কান্তি সিকদার, সফিকুর রহমান সিকদার, আবদুল ছামাদ, বসন্ত কুমার দাশ, প্রাণহরি নাথ, মো: দেলোয়ার হোসেন, আকতার আহমদ সিকদার, মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, মো: জসিম উদ্দীন, আবুল কালাম, ছিদ্দিক আহমদ, মো: কামাল উদ্দীন, আহমদ কবির, মুহাম্মদ মিয়া, নজির আহমদ, আলী আহমদ, গোলাম রশিদ, মো: এরশাদুল হক, কামাল উদ্দীন, আবুল হাসেম, কবির আহমদ, মোহাম্মদুল হক, আব্দুস সালাম মাষ্টার, আব্দুস ছালাম, রাজা মিয়া, আব্দুস শুক্কুর রশিদী, মো: দুদু মিয়া, সিরাজুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, মমতাজুল ইসলাম, মো: জামাল উদ্দিন, মো: ইদ্রিস, নুর আহমদ, হরি রঞ্জন রুদ্র, ফেরদৌস আহমদ, মো: ইসহাক, বজল আহমদ, আব্দুল রশিদ, অনিল চন্দ্র নাথ, মমতাজুল ইসলাম, সন্তোষ কুমার বড়ুয়া, আব্দুল হাকিম চৌধুরী, ফয়েজ আহমদ, আ.ক.ম নুরুন্নবী চৌধুরী, ছিদ্দিক আহমদ, মৃত আছহাব মিয়া, মৃত ফজল করিম, শহীদ মো: ইউসুফ, মৃত আহমদু হক, মৃত রনজিত কুমার, মৃত শামসুল আলম, মৃত সুনিল কান্তি বিশ্বাস, মৃত মফিজুর রহমান, মৃত জহির আহমদ, মৃত বাবু সুকুমার দাশ, মৃত কবির আহমদ, মৃত এমএ করিম চৌধুরী, মৃত মো: জালাল উদ্দীন, মৃত জাকের আহমদ, মৃত হরি রঞ্জন নাথ, মৃত অধ্যাপক নাজিম উদ্দিন, মৃত সুভাষ মজুমদার, মৃত আলহাজ্ব মো: আবদুল গফুর, মৃত আলহাজ্ব গোলাম কাদের, মৃত জয়নাল আবেদীন, মৃত মো: সৈয়দ নুর, মৃত বশির আহমদ, মৃত সফিকুর রহমান, মৃত আবুল বশর, শহীদ সিরাজুল হক, মৃত হাবিবুর রহমান চৌধুরী, মৃত মনমোহন নাথ, মৃত আহম্মদ কবির, মৃত ডা. পরিতোষ কান্তি নাথ, মৃত আবুল কাশেম, মৃত শামসুল হক ও মৃত মো: ইউসুফ। উপজেলার বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আকতার আহমদ সিকদার ও ডিপুটি কমান্ডার আবদুল হামিদ বেঙ্গল।


তথ্যসূত্রঃ ১। লোহাগাড়া ইতিহাস ও ঐতিহ্য বই, লেখকঃ মোহাম্মদ ইলিয়াছ।

২। ইন্টারনেট।

About Tamzid20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *