Home / আলোকিত ব্যক্তিত্ব / সেক্টর কমান্ডার শহীদ মেজর নাজমুল হকের জীবনী

সেক্টর কমান্ডার শহীদ মেজর নাজমুল হকের জীবনী

সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ
মেজর নাজমুল হক ১৯৩৮ সালের ১লা আগস্ট চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবার নাজির বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম অ্যাডভোকেট হাফেজ আহমেদ ও মা মরহুমা জয়নাব বেগম। পিতা হাফেজ আহমেদ ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম “প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট”। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
মেজর নাজমুল হকের সহধর্মীনি নাওশাবা চৌধুরী। তিনি দুই কন্যা সন্তানের জনক। বড় মেয়ে ইসরাত জাহান সুরভী। তার স্বামী লুৎফুর রহমান। ছোট মেয়ে নওরীন সাবাহ্ শিউলি। তার স্বামী তারিকুল ইসলাম।

শিক্ষা জীবনঃ
মেজর নাজমুল হকের পিতা মরহুম অ্যাডভোকেট হাফেজ আহমেদ কলকাতায় আলীপুর কোর্টে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত থাকার কারণে তাঁকে লোহাগাড়ার চুনতি গ্রামে নানার বাড়িতেই শৈশব কাটাতে হয়। চুনতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। এরপর তাঁর বাবা কুমিল্লা বদলি হন। বাবার চাকরির সুবাদে কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালাতে চলে মেজর নাজমুল হকের মাধ্যমিক শিক্ষা। ১৯৫০ সালে এই স্কুল থেকে তিনি মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ঢাকার আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে(বর্তমানে বুয়েট) ভর্তি হন।

কর্মজীবনঃ
আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের(বর্তমান বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় দেশমাতৃকার মুক্তির চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে আর্টিলারি কোরে কাকুল থেকে কমিশনপ্রাপ্ত হন।
তিনি আর্টিলারি ইউনিট, সেনাসদর ও গোয়েন্দাবাহিনীতে বেশ কিছুদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালের পাক-ভারত যুদ্ধেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৮ সালে ফাইটার বিমানগুলোর নিরাপত্তার জন্য তাকে বিমানবাহিনীতে বদলি করা হয়। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা Inter security intelligence(ISI) এর একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকায় বদলি করা হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাকে এই তরুণ সৈনিকের মন দেশ মাতৃকার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। অবিভক্ত বাঙালির উপর পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, অত্যাচার, নির্যাতন ও অবিচার সহ্য করতে না পেরে তিনি মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেন। যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন আগে ১৮ মার্চ তাকে নওগাঁয় ৭ ইপিআর উইংয়ের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে তাকে প্রেরণ করা হয়। অবাঙালি উইং কমান্ডিং অফিসার মেজর আকরাম বাঙালি উইং কমান্ডিং অফিসার মেজর নাজমুল হকের উপর ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হচ্ছিলেন না। ২৪ মার্চ মেজর আকরাম গ্রেফতার হলে মেজর নাজমুল হক জোর করেই নিজ দায়িত্ব বুঝে নেন। তিনি রাজশাহী জেলা, পাবনা জেলা, বগুড়া জেলা এবং দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গড়ে ওঠা ৭ নং সেক্টরের কমান্ডার পদে ১৯৭১ এর এপ্রিল থেকে অগাস্ট মাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তরংগপুর ছিল তাঁর হেডকোয়ার্টার। তাঁর সেক্টরে তিনি গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতেন এবং মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতেন যারা প্রথাগত সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলো না। প্রায় পনের হাজার মুক্তিযোদ্ধা এ সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর তাঁর অধীনেই যুদ্ধ করেন।
২৫ মার্চ কালো রাতে পাক সেনাদের হামলা শুরু হলে পরদিন স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে তিনি নওগাঁ মহকুমাকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন বাংলার অংশ ঘোষণা করেন। স্থানীয় যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলেন ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্ট মুজাহিদ বাহিনী। সেই বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে প্রথমে তিনি নওগাঁ ও বগুড়ার পাক ক্যাম্প দখল করে তিনি সমগ্র বগুড়া শহরকে শত্রুমুক্ত করেন। ২৮ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে তাঁর বাহিনীর দ্বিমুখী আক্রমণে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে হানাদাররা। দিনাজপুরের ধনধনিয়াপাড়ায় ১৮ জুন, ১৯৭১ তারিখে বড় রকমের এক যুদ্ধের পর ওই এলাকা মেজর নাজমুলের বাহিনীর দখলে আসে। এতে ১৪ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়।
বর্ণবাদ বিরোধী মার্কিন মানবতাবাদী নেতা মার্কিন লুথার কিং জুনিয়র যমনি বলতে পেরেছিলেন- I have a dream, American Dream. তেমনি আত্মপ্রত্যয়দীপ্ত মহান এ সমর নায়ক মেজর নাজমুল হকও সেদিন বলতে পেরেছিলেন- আমার একটা স্বপ্ন আছে বাংলাদেশের স্বপ্ন।

তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাসমূহঃ
৪৩, বি.ডি.আর. ব্যাটালিয়ন নওগাঁ কর্তৃক স্মরণীয় ফলক স্থাপন, নওগাঁয় স্থাপিত একটি সড়ক, ঢাকার মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরে সেক্টর কমান্ডারদের সাথে উনার ছবিসহ মুক্তিযুদ্ধে উনার অবদানের কথা, গুলশান-২ এর ৭১ নং সড়কের নামকরণ, রাজশাহী রোডস্থ ওভারব্রিজের পাশে স্মৃতিফলক, চট্টগ্রাম শহরে শহিদ সেক্টর কমান্ডার নাজমুল হক স্মৃতি সংসদ, লোহাগাড়ায় নিজ বাড়ির দক্ষিণ পার্শে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ। গ্রামে একটি সড়ক শহীদ মেজর নাজমুল হক সড়ক, লোহাগাড়ায় জেলা পরিষদ কর্তৃক স্থাপিত একটি পাঠাগার, বার আউলিয়া ডিগ্রি কলেজে একটি ভবন তাঁর নামে নামকরণ করা হয়। তাছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে আদৌ অন্য কোথাও কোন স্থাপনা তাঁর নামে নামকরণ করা হয়নি।

মৃত্যুঃ
লোহাগাড়ার সূর্য সন্তান, দেশের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করা একমাত্র বীর সৈনিক, সেক্টর কমান্ডার শহিদ মেজর নাজমুল হক যুদ্ধ চলাকালীন সময় ৭নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় ১৯৭১ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর মিত্রবাহিনীর সাথে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক শেষে ভারতের শিলিগুড়ি ক্যান্টনমেন্ট থেকে স্বদেশে ফেরার পথে জিপ দুর্ঘটনায় শাহাদাৎ বরণ করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গনে বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও তাঁর প্রিয় কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের সমাধি রয়েছে।

About Tamzid20

Check Also

লোহাগাড়ার লিজেন্ড মিঃ মাসুদ খানের জীবনী ও খান পরিবার

চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নে ঐতিহ্যবাহী খান পরিবারে ১৯৫৪ সালের ৩০শে জুলাই মিঃ মাসুদ …

লোহাগাড়ার কৃতি সন্তান সহকারী অধ্যাপক মহিউদ্দিন মাহি

সহকারী অধ্যাপক মহিউদ্দিন মাহি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের নারিশ্চা গ্রামে ১৯৮৯ সালের ১লা মার্চ …

মাওলানা আব্দুন নূর সিদ্দিকী চিশতী (রহ)’র জীবন চরিতঃ মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন

বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর হাদীস বিশারদ হিসেবে যে সকল ক্ষণজন্মা মহান ব্যক্তিবর্গের নাম গণনা করা হয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *