Home / গল্প / রহস্যগল্প “খবিস” -মিজান উদ্দিন খান বাবু। 

রহস্যগল্প “খবিস” -মিজান উদ্দিন খান বাবু। 

লোকটাকে প্রথম দেখাতেই আমার অপছন্দ হয়েছিলো।মোঙ্গলিয়ান চেহারাটায় কোথায় যেন একটা অশুভ ভাব আছে। অসম্ভব ধূর্ত দুটি চোখ, সারাক্ষণ লোভে চকচক করছে। ইদুঁরে কান। থ্যাবড়া নাক। সুবিশাল ঠোঁট, বড় বড় নোংরা হলুদ দাঁতের ফাকে পুরানো সব খানাপিনা। নিচের মাড়ির ডান দিকের একটা দাঁত আবার অত্যন্ত সূঁচালো অনেকটা কাল্পনার পিশাচের মতো। অথচ বেটে খাটো উচ্চতায় মজবুত শরীরে ছাই কালারের স্যুটে তাকে বেশ মানিয়েছিলো।এ্যাপোলো শপিং সেন্টারের এ দোকান ও দোকানে ঢু মারছিলো সে। তারপর হঠাৎ করিডোর থেকে ভোজবাজির মত অদৃশ্য হয়েছিলো। অথচ তার পায়ে ছিলো ভারী ইতালিয়ান সুজ। হতে পারে আমার অন্য মনস্কতার ফাকে সে বিপরীত দিকের রাস্তাটা ব্যবহার করেছিলো। অর্থাৎ কোন কারণে আমার কৌতুহলটা তার দৃষ্টিতে এসেছিলো।

পরের দিন…..

সবে নিউমার্কেটে ডায়মন্ডে ঢুকেছি। বিপরীত দিকের টেবিলে থেকে আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই অপছন্দ।

এতো দেখছি শিকার করতে এসে নিজেই শিকার বনে গেলাম। হটাৎ মনে হলো আমার মাথা ঘুরছে, চোখে ঝাপসা দেখছি, পা দুটি অদৃশ্য ক্ষমতার বলে জড়পদার্থে পরিণত হয়েছে। আর আমি গলে গলে যাচ্ছি। অনেক দূর থেকে কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। অথচ আমি নির্জীব, সবই দেখতে পাচ্ছি কিন্তু কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই।ঠিক কতক্ষন পরে আমার হুঁশ ফিরেছিলো মনে করতে না পারলেও বুঝেছিলাম বেশ অনেকক্ষণ পরে! কারণ, বিকেলের বয়স বেড়ে রাত এসেছে। নিয়ন সাইনগুলি মায়াবিনির মতন হাতছানি দিচ্ছে।হতে পারে দিনের ক্লান্তি ভর করেছিলো আমায়।

তিনদিন পর……

সকাল থেকে কেন যেন মনে হচ্ছিল আজকে আবার অপছন্দের সাথে দেখা হতে পারে। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম এবার তার গতিবিধির উপর আরো তীক্ষ্ম নজর রাখবো। প্রয়োজনে ছাবেরকে কাজে লাগাবো। টিকটিকি হিসাবে যার পারদর্শীতা এক কথায় অসাধারণ। ছাবের মূলত: ব্যবসায়ী। তবুও বাল্যবন্ধু বলে কথা। বলতেই রাজি হয়ে গেলো। শুধু শর্ত দিলো তাকে যখন তখন মুঠো ফোনে   রিং দেয়া চলবে না। আমি রাজী। অত:পর ছাবেরকে নিয়ে ডিসি হিলের দিকে বেরিয়ে পড়ি।

ফুলের দোকান ধরে হাটছি আর নেশায় টলমল করছি। মাত্রা আরো বেড়ে গেলো যখন সুরেশের সামনে এসে দাড়ালাম। ইয়া বড় বড় হারমোনিয়াম গিটার পুরানো সেতার আরো কত কি! হঠাৎ বাম হাতে চাপ অনুভব করতে পিছন থেকে দেখি ছাবেরের ইশারা।

ডাস্টবিন ঘেটে খাচ্ছে পাগলি তরুণী। মুহুর্তে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনি হায়রে মানবতা! এখন বেলা সোয়া এগারটা। বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি দুই বন্ধু। আমার কেন জানি বদ্ধধারণা কিছুক্ষণের মধ্যেই অপছন্দ এখানে আসবে। ঠিক তিনদিন আগে নিউমার্কেটের মতো।যদিও এখনো পর্যন্ত অপছন্দ খারাপ কিছু করেছে এমনটি প্রমাণ পাইনি, তবুও আমি কনফার্ম সে কোন একটা গং এর সাথে জড়িত অথবা স্বয়ং একজন ক্রিমিন্যাল বা মেনিয়াক। আচ্ছা সে কি বিদেশী?

কি জানি হতেও পারে। বোঝা যাচ্ছে না। উত্তর চট্টগ্রামে একটা পরিবার আছে যার সদস্যরা সবাই ইউরোপিয়ানদের মতো। ঐ বাড়িকে সবাই বিদেশীর বাড়ি নামে চিনে।

রিকসা থেকে নেমে দাড়ালো মধ্যবয়সী। হ্যাঁ মিস্টার অপছন্দ। তারপর ডানে বামে না তাকিয়ে সোজা বৌদ্ধমন্দিরে ঢুকে গেলো। বাহিরে আমরা দুইবন্ধু। শত কল্পনা আর ডিটেকটিভ উত্তেজনায় অস্থির!

৩৭ মিনিটের মাথায় অপছন্দ মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন। এবার তার হাতে একটা গানি ব্যাগ। ইতিমধ্যে আমরা একটা পিলারের আড়ালে লুকিয়েছি। তবে এবার অপছন্দকে বেশ সর্তক মনে হচ্ছে। আচ্ছা কি আছে ঐ গানি ব্যাগে? দ্রুত রিকসা ডেকে ব্যাগ হাতে প্রস্থান করলো অপছন্দ। রিকসা আমরাও নিয়েছি। বোস ব্রাদার্স পেরিয়ে অনুসরণ করে সিনেমা প্যালেসের দিকে যাচ্ছি। আর মাত্র একশ গজ, তারপরেই বুঝা যাবে অপছন্দের গন্তব্য স্থল কোনদিকে। আন্দরকিল্লা, লালদিঘী নাকি বিপরীত দিকের কোন রাস্তা। উত্তেজনায় টগবগ করছি দুই তরুণ! মনে হচ্ছে আমিই মেজর মাসুদ রানা এম.আর.নাইন আর ছাবের ডানহাত কাটা সোহেল। বিসিআই’এর এডমিন চীফ।

রিকসা এখন টেরিবাজার পেরিয়ে আজিজ কোম্পানীর গলির মুখে।এবার অপছন্দ কি বামে যাবে নাকি ডানে? আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বিপরীত দিকের রাস্তা ধরলো। অত্যন্ত সংকীর্ণ চাপা একটা রাস্তা। যেদিকে সাধারণত কেউ তেমন একটা চলাচল করে না।

পুরানো দিনের জরাজীর্ণ দু’তলা ভবন। ঠিকানায় লেখা আছে এসকান্দর ভিলা, আফিমের গলি টেরিবাজার চট্টগ্রাম।

যাক, অপছন্দের বাসস্থান পর্যন্ত অবগত হওয়া গেল। এবার যেকোন সময়ে রাত্রে বা দিনে তল্লাশী চালালেই আশা করছি রহস্যের জট খুলবে।

তারপরেও গোয়েন্দা মন বলে কথা। ছাবেরকে বললাম- আমি থাকাবস্থায় তুমি চট করে গিয়ে শামীম হোটেল থেকে খেয়ে আস। তারপর অপছন্দের গতিবিধির উপর নজর রাখবে। আমাকে অবাক করে দিয়ে ছাবের বললো- অপেক্ষার দরকার কি? চলো এখনি চুপিসারে ভবনে ঢুকে পড়ি।

যেই কথা সেই প্রস্তুতি। পায়ে মোকাসিন’ মুখে সিল্কী রূমাল’ অফ করি দু’জনের মোবাইল সুইচ।

             ছাবেরের দেখানো পথে হাটছি। মনে হয় কোন এক সময় এখানে উইপোকার ঢিবি ছিলো। জায়গাটা এখনো বেশ উচু। ছাবের ইশারা করতে ওখানে উঠে পড়ি। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নীচতলার কিচেনের পিছন দিকের দরজাটা। আর কেউ একজন ওখানে এসে এইমাত্র দাড়ালো। হাতে তার ঐটা কি?                                                                   আরে সর্বনাশ এতো দেখছি লম্বা ধারালো কিরিচ! আর লালসালুতে আবৃত ব্যক্তিটির গড়ন হবহু অপছন্দের মতো! তবে কি সে?

ঘন সুপারী গাছগুলোর একটির সাথে পাশাপাশি দু’টি কালো দেশী কুকুর নাইলনের রশি দিয়ে বাঁধা। অথচ কুকুরের চেঁচানো স্বভাব ভুলে কেমন যেন শান্ত হয়ে আছে।

ছাবের বললো- দেখ বন্ধু কুকুর দুটি কিভাবে ঝিমুচ্ছে! ও দুটোকে সম্ভবত নেশাজাতীয় কোন দ্রব্য প্রয়োগ করা হয়েছে।

ধারালো কিরিচ হাতে ধীর পায়ে নত মস্তকে এগিয়ে যাচ্ছে অপছন্দ। পরমুহুর্তে ডানদিকের কুকুরটিকে দেখলাম মাটিতে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে। অক্সিজেনের অভাবে গরগর শব্দ বের হচ্ছে তার কাটা রগ দিয়ে! এবার আকাশের দিকে মুখ তোলে অপছন্দ বিড়বিড় করে কি যেন বললো। তারপর কিরিচ হাতে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল।

পরমুহুর্তেই গানি ব্যাগ হাতে কুকুরের সদ্যকাটা মস্তকের পাশে এসে হাটু গেড়ে বসলো মি: অপছন্দ। এবার কি করতে যাচ্ছে সে?

চোখ বুজে মন্ত্র জপে একটানে গানি ব্যাগ থেকে বের করে আনে একটি দেশি কচি লাউ!

লাউয়ের মাঝ বরাবর গেঁথে আছে একটি বাঁশের এক হাতি চিকন খুঁটি! এবার দক্ষিণে ফিরে সেজদায় পড়ে মেনিয়াক। দীর্ঘক্ষণের সেজদা শেষে পরম আদরে কুকুরের কাটা মস্তকে হাত বুলিয়ে মস্তকটি খুঁটির উপরের দিকে গেঁথে ফেলে। তারপর আগে থেকে করে রাখা গর্তের মধ্যে ঐভাবেই কচি লাউসহ কাটা মন্ডুটি ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দেয়। বিড়বিড় করে মন্ত্র জপে।

এতক্ষণ যা দেখলাম তাতে মনে হচ্ছে অপছন্দ একজন শয়তান সাধক। দুষ্টকে তুষ্ট করতে তার এই বিচিত্র আরাধনা বলিদান!

এক মাস পর…..

দৈনিক আজাদীর চটকদার এক বিজ্ঞাপনের ছবি দেখে আমি লাফিয়ে উঠি। ছবিতে মি: অপছন্দ নিচে তার নামের আগে অনেক বিশেষণ তারপর লেখা রিপন লামা। আপনার মুখ দেখে যিনি বলে দিতে পারেন  আপনার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত ইত্যাদি ইত্যাদি। মুহুর্তে ডান হাত চলে যায় আমার মুঠো ফোনের খোঁজে।

: হ্যালো ছাবের, আজকের আজাদীটা হাতে নে। দেখবি সেই মেনিয়াকটা এবার গণকের বেশ ধরেছে। : তাই নাকি? : তুই এখুনি গিয়ে গণক ঠাকুরকে হাত দেখিয়ে আমাকে রেজাল্ট জানা।

যদিও আমি জানি অব্যর্থ মন্তব্যে ছাবের চমকে যাবে। চমকে যাবে আর সবাই। শয়তানের সাগরেদ নির্ভুল হবে তার মন্তব্য। তবে সবই ভেল্কিবাজী।


লেখকঃ মিজান উদ্দিন খান বাবু। 
চুনতি ডেপুটি বাড়ি 
লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম। 

About Tamzid20

Check Also

যৌতুক ও সমাজঃ এন.আই.পারভেজ

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাতরাশ সারাটাই আরিফের কাজ। আজও তার ব্যাতিক্রম নয়। ব্যাতিক্রম শুধু তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *