Home / আলোকিত ব্যক্তিত্ব / ড. মুহাম্মদ ইসমাইল এর জীবনী

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল এর জীবনী

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার কলাউজান ইউনিয়নের পূর্ব কলাউজান গ্রামের রবি চাঁন সিকদার বাড়ীতে ১৯৭৮ সালে জন্ম করেন। বাবা আবদুল মাবুদ সিকদার  পেশায় ব্যবসায়ী এবং মা ছেমন আরা গৃহিনী। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। গ্রামের মধ্য-কলাউজান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার স্কুল জীবন শুরু। প্রাইমারী স্কুল জীবনের অধ্যায় শেষ করে ১৯৮৯ সালে কলাউজান ডা.এ.ব.র.সি. উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মাধ্যমিক স্কুলে ৮ম শ্রেণী ছাড়া সব ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন তিনি। ৮ম শ্রেণিতে মাত্র ২ নাম্বার কম পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন আর তখনি তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন পরের বছরগুলোতে তাকে ক্লাশের ফাস্ট বয় হতে হবে এবং হয়েছিলও। স্কুলে সে সময় (১৯৯২-৯৪) বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গণিত পড়ানোর মতো কোন শিক্ষক ছিল না। তিনি আর বন্ধু কাসেম (বর্তমানে বাপেক্স এ কর্মরত) অনেক কষ্টে নিজেদের মতো করে পড়ে ঐ কোর্সের এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং তিনি স্টার মার্কও পেয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মোট ফলাফলে লোহাগাড়ার পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ২য় সর্বোচ্চ মার্ক পেয়েছিলেন।

মাধ্যমিক স্কুল পাঠ শেষে চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন। সে সময় (অবশ্যই এখনও) চট্টগ্রাম বিভাগের সব মেধাবী শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির জন্য উন্মুখ থাকতো। ভর্তি পরীক্ষার জন্য ব্যাপক পড়াশুনা করতে হতো। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করার পর মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য কোচিং করে। দূর্ভাগ্যক্রমে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার দিন প্রচন্ড জ্বরের কারণে মেডিকেলে চান্স পেলেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেস্টিতে ভর্তির জন্য মনোনীত হন। পরবর্তী বছর মেডিকেলে আবার ভর্তি পরীক্ষা দিবে এই আশায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফরেস্ট্রিতে ভর্তি হন কিন্তুু ডাক্তার হওয়া তাঁর ভাগ্যে হয়তো ছিল না, পরের বছরও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার সময় প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত। ফলে ডাক্তার হওয়ার সাধ আর পূরণ হলোনা। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগে চান্স পান এবং ভর্তি হয়ে যাই এবং সে সুবাদে ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি উনার চিন্তার জগতে আমুল পরিবর্তন আনে। বি.এসসি (সম্মান) ফাইনাল পরীক্ষায় ১ম শ্রেণিতে ২য় স্থান লাভ করেন এবং মাস্টার্সে ১ম শ্রেণিতে প্রথম হন। তিনি উপলব্ধি করলেন পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই।

মাস্টার্সে পড়া অবস্থায় বিসিএস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন চাকুরীর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেন। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে দেখে ক্লাশমেট ও হল মেটরা (শহীদুল্লাহ হল) খুব হাসাহাসি করত এবং বলত তুমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে যাবে (যেহেতু রেজাল্ট ভাল), কষ্ট করে কেন বিসিএস এর জন্য পড়ছ?

এটা উল্লেখ্য যে, মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিনই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের অধীনে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যোগ দেন। ২০০৮ সালে ২৭তম বিসিএস এ প্রশাসন ক্যাডার এ মনোনীত হন। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে প্রভাষক পদের জন্য মনোনীত হন। জীবনের এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন তিনি। বিসিএস (প্রশাসন) নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। দুই সেক্টরের কাজের পরিধি ও প্রকৃতি ভিন্ন রকম এবং উভয় ক্ষেত্রেই দেশের মানুষের সেবা করার অবারিত সুযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকেই তিনি বেছে নিলেন। যোগ দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। শিক্ষকতা, গবেষণা ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি। এর মধ্যেই উচ্চ শিক্ষার (ডক্টরেট) ডিগ্রী করার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও বৃত্তির জন্য আবেদন করেন। অনেক সুযোগ আসলেও চাকুরীর বিভিন্ন বাধ্যবাধকতায় ২০১১ সালের আগে উচ্চ শিক্ষার জন্য ছুটি পাননি। ২০১১ সালে তিনি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক স্কলারশিপ (যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়) ইউরোপিয়ান কমিশন স্কলারশীপ (স্পেনের সান্তিয়াগো বিশ্ববিদ্যালয়) ও বঙ্গবন্ধু স্কলারশীপ (যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়) সহ অন্যান্য স্কলারশীপ এর জন্য মনোনীত হন। বিশ্বের নামী-দামী সব বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝে র‌্যাংকিং এ ১ নম্বর এ থাকা ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী করার জন্য সিদ্ধান্ত নেন এবং জানুয়ারি ২০১২ সালে শিক্ষাছুটি নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি শুরু করেন। প্রায় সাড়ে ৪ বছর পর জুলাই ২০১৬ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন এবং দেশে ফিরে এসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।

তিনি ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস কমানো যায় এবং বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করা যায় তা নিয়ে গবেষণা ও অধ্যয়ন করেছেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাঁর গবেষণা ভিত্তিক ৩৬টি প্রবন্ধ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও আমেরিকা, ইটালী, সুইডেন, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্যসহ প্রায় ১৫টি দেশে ৩০টির বেশী কনফারেন্স এ তার গবেষণা উপস্থাপন করেছেন। বর্তমানে পরিবেশ দূষণ রোধ, জৈব জ্বালানি (ইরড়ভঁবষ) ও শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ক্যাটালিস্ট তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা কর্ম চলছে।

তিনি বলেন, শিক্ষা ছাড়া একটি জাতি যেমন সভ্য হতে পারে না, তেমনি গবেষণা ছাড়া কোন দেশ উন্নতির শিখরে পৌছতে পারে না। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশসমূহ শিক্ষা ও গবেষণায় পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে না বলেই আজো আমরা জাতি হিসেবে উন্নয়নের সোপানে অনেক পিছিয়ে আছি। কিন্তু আমরা যদি স্ব-স্ব অবস্থায় থেকে দেশের জন্য কাজ করি, আমার বিশ্বাস আমরা অদূর ভবিষ্যতে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবো। এক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মকে সবার্গ্রে এগিয়ে আসতে হবে। ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার পরামর্শ-

১। পরিশ্রমী হোনঃ সাফল্যে আপনার হাতে ধরা দিবেই; সৃষ্টিকর্তা সবাইকে একই ধরণের মেধা ও প্রতিভা দেয়নি কিন্তু তা আপনার কাছে যে মাত্রায় থাকুক না কেন আপনার অক্লান্ত পরিশ্রম আপনাকে সফলতার দুয়ারে নিয়ে যাবে।

২ । জীবনের ডিকশনারীতে ‘হতাশা’ নামক শব্দটি রাখা যাবে না। প্রত্যেকের মধ্যে কোন না কোন সুপ্ত প্রতিভা লুকায়িত আছে। হতাশা আপনার লুকায়িত প্রতিভাকে ধ্বংস করে দেবে। জীবনের কোন এক ক্ষেত্রে সফল না হওয়া মানে এই নয় যে, আপনি সফল মানুষ না। বরং আপনি জীবনের অন্য ক্ষেত্রগুলোতে আরো মনযোগী হোন, দেখবেন জীবন আরো আনন্দময় হয়ে উঠবে।

৩। বিনয়ী হোনঃ আমাদের সমাজে বিনয়কে হয়তো দূর্বলতা ভাবা হয় কিন্তু বিনয়ের মাধ্যমেই আপনার মনুষ্যত্বের প্রকাশ পায়।

আমার বিশ্বাস আমরা সকলে যদি স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ইত্যাদির প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সচেতন হই এবং যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করি তাহলে আমরা সহজেই বিশ্বের দরবারে মাথা উচুঁ করে দাড়াঁতে পারবো।

About Tamzid20

Check Also

নোমান গ্রুপের সফলতার পেছনের গল্প!

নোমান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম। দেশের টেক্সটাইল খাতে তার অভিজ্ঞতা ও অবদান সর্বজনবিধিত। …

লোহাগাড়ার লিজেন্ড মিঃ মাসুদ খানের জীবনী ও খান পরিবার

চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নে ঐতিহ্যবাহী খান পরিবারে ১৯৫৪ সালের ৩০শে জুলাই মিঃ মাসুদ …

লোহাগাড়ার কৃতি সন্তান সহকারী অধ্যাপক মহিউদ্দিন মাহি

সহকারী অধ্যাপক মহিউদ্দিন মাহি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের নারিশ্চা গ্রামে ১৯৮৯ সালের ১লা মার্চ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *