Home / উন্মুক্ত পাতা / পরিবারই হউক মা-বাবার বৃদ্ধাশ্রম

পরিবারই হউক মা-বাবার বৃদ্ধাশ্রম

“বৃদ্ধাশ্রম” যেখানে ঠাঁই পান বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। বৃদ্ধাশ্রম মূলত পরিবার থেকে আলাদা একটা ঘর। যেখানে হাসি, খুশিতে কথা বলার মত মানুষ থাকে। থাকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা। কিন্তু থাকে না আপন মানুষগুলো। রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলো থেকেও যেন হারিয়ে গেছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার। কিছু বিত্তবান সন্তানরা বৃদ্ধ মানুষদেরকে ঠাঁই করে দিতে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করে। আর তাদের মতো কিছু বিত্তবান সন্তানরাই আবার বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখেন। বৃদ্ধাশ্রমে থাকা বেশিরভাগ মানুষরাই জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন কি জানেন? তারা নিজের সারাজীবনের কষ্টে অর্জিত ধন-সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ সময় সন্তানদের জন্য বিনিয়োগ করেছেন। নিজের কথা কখনো ভাবেন নি, নিজের জন্য কিছু রাখেননি। তারাও একসময় খুব বর্ণাঢ্য জীবন পার করেছেন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন নামী-দামি ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চাকরিজীবী ইত্যাদি। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে তাদেরকেই সন্তানদের কাছে অবহেলিত হতে হয়েছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাচীন চীনের শান রাজবংশে। মূলত গৃহহারা অসহায় বৃদ্ধ নারী, পুরুষের জন্য খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ শতকে শান বংশ এই বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করেছিল। যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করার সুব্যবস্থা ছিল। ইতিহাসবিদেরা এই বৃদ্ধাশ্রমকে সভ্যতার অন্যতম সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবহিত করেছেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে এই বৃদ্ধাশ্রম ব্যবহৃত হয় ভিন্নার্থে। বর্তমান সুশিল সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের কাছে বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারলেই দায়মুক্তি। নানা অজুহাতে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে সবাই ছোট হয়ে যায়। এরপর বৃদ্ধ মা-বাবা অবহেলার শিকার হন। বৃদ্ধ মা-বাবা হয়ে যান নিঃস্ব। যার কারণে মা-বাবা বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বাধ্য হন। এই বুঝি জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি?
বদ্ধাশ্রমে পাঠানোর পর আত্মীয়স্বজনরা, সন্তানরা খবর নেন না। ঈদ, পূজা, আনন্দ, উৎসবে কেউ মা-বাবাকে বাসায় নিয়ে যান না। এমনকি একটি ফোনও করেন না অনেকেই। বাবা-মা রা তারপরও কিছু করতে পারেন না। ধৈর্য্য ধরে থাকেন। বৃদ্ধাশ্রমে সন্তানদের, স্বজনদের, নাতি, নাতনীদের জন্য অপেক্ষা করেন। কবে একটি ফোন আসবে…. সন্তানদেরকে ছোট বেলায় লালন-পালন, আদর যত্ন করে বড় করার কথা মনে পড়লে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর অশ্রুপাত করেন।
জীবনের অর্থ কিসে আসলে?
মানুষ কর্ম করে, বিয়ে করে সংসার করেন। আশা করে থাকেন বৃদ্ধ হয়ে সন্তানদের সাথে, নাতি নাতনীর সাথে হাসি খুশিতে জীবন কাটিয়ে দিবেন। তাদের সাথে জীবনের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করবে। কিন্তু আপসোস! শেষ জীবনের এই অরাধ্য আনন্দের লেশমাত্র তারা পান না। বৃদ্ধাশ্রমে মানসিক যন্ত্রণা আর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আবেগাপ্লুত হওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। মাঝে মাঝে ইলেকট্রিক মিড়িয়া, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বৃদ্ধাশ্রম থেকে সাংবাদিকরা ফিরে বৃদ্ধাশ্রমে সাক্ষাত হওয়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জীবন কাহিনী নিয়ে রিপোর্ট লিখেন। খুব অবাক লাগে যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে সন্তানদের মানুষ করার কথা পত্র পত্রিকায় ছাপানো হয় তখন। যে মা-বাবা নিজেরা না খেয়ে সন্তানদের খাইয়েছেন। সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার জন্য কত বিনিদ্র রজনী মা-বাবারা পার করেছেন। সেই মা-বাবাদের খবরাখবর নেওয়ারও প্রয়োজনবোধ করেন না সন্তানরা। সন্তানদেরকে ঈদের কাপড় কিনে দেওয়ার জন্য মা-বাবা কাপড় কিনতে পারেনি। আর সেই মা-বাবারা বৃদ্ধাশ্রমে একা ঈদ করেন। এ কেমন সভ্যতা?
সবার মনে রাখা উচিৎ, আজকে যিনি সন্তান, কালকে তিনি একজন বাবা। আজকে যিনি নবীন, কালকে তিনি প্রবীণ। বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবারা কোমলমতি শিশু হয়ে যান। তাই মা-বাবার খবরাখবর, আদর যত্ন করার দায়িত্ব সন্তানদের। এজন্য বৃদ্ধ মা-বাবার জীবনযাত্রার পরিবেশ সন্তানদেরকে নিশ্চিত করতে হবে। বৃদ্ধ মা-বাবাদের নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী তৈরি করতে হলে তাদেরকে সাধ্যমত নিজেদের কাছে রেখে সুখে শান্তিতে রাখতে হবে। পরিবার থেকে যেন মা-বাবা বাদ না পড়েন সেদিকে নজর রাখতে হবে। তাহলেই মা-বাবার প্রতি সন্তানের কর্তব্য যথাযথ পালন করা হবে।

লিখেছেনঃএম. তামজিদ তাহসিন।

About Tamzid20

Check Also

আজ লেখক আহমদ ছফার জন্মদিনঃ হিযবুল্লাহ রায়হান

১৯৪৩ সালের ৩০শে জুন চট্টগ্রামের গাছবাড়িয়ায় প্রত্যন্ত এক গ্রামে ছেলেটির জন্ম। কাঠমিস্ত্রি ও কৃষক বাবার …

লোহাগাড়া উপজেলায় ইটভাটা স্থাপনে মানা হচ্ছে না নিয়ম 

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশ দূষণ রোধকল্পে লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের নোয়ারবিলা এলাকার মানুষের পক্ষে লিখছেন- …

সংস্কৃতির আত্মানুসন্ধানে ১লা বৈশাখের অগ্রযাত্রা

নজরুল ইসলাম তোফাঃ বাংলা পঞ্জিকার ১ম মাস বৈশাখের ১ তারিখেই হয় ‘পয়লা বৈশাখ’ বা ‘পহেলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *