Home / প্রিয় লোহাগাড়া / ঐতিহাসিক চুনতি মাহফিলে সীরতুন্নবী (স:) এর ইতিবৃত্ত

ঐতিহাসিক চুনতি মাহফিলে সীরতুন্নবী (স:) এর ইতিবৃত্ত

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহর একত্ববাদ ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে এই অগণিত নবী-রাসুলগণের পুরো জীবন অতিবাহিত হয়েছে। সর্ব প্রথম হযরত আদম (আ:) যিনি পৃথিবীর প্রথম মানব, মানব জাতির পিতা তাঁর শুভাগমনের মাধ্যমে নবীর ধারাক্রমের সূচনা হয়। উনার পর বহু নবী-রাসুল এই পৃথিবীতে আসেন। আল্লাহ যুগে যুগে এই নবী-রাসুলগণের কাছে ওহি প্রেরণ করেন। যে ওহি পরবর্তিতে কিতাবে রূপ নেয়। উনাদের উপর আল্লাহ ছোট বড় ১০৪ খানা আসমানী কিতাব নাযিল করেন। এর মধ্যে ৪ খানা বড় কিতাব। তাওরাত, যাবুর, ইনজিল এই তিনটি পূর্ববর্তী কিতাব। সর্বশেষ যেটি মানবতার মুক্তির সনদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেটি হচ্ছে পবিত্র আল কুরআন। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর ওপর এই মহাগ্রন্থ, মহিমান্বিত কিতাব অবতীর্ণ হয়। তিনিই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। পবিত্র আল কুরআন সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বশেষ কিতাব। হযরত মুহাম্মদ (স:) যে শেষ নবী সেটা আল্লাহ পূর্ববর্তী কিতাবেও উল্লেখ করেছেন। হযরত মুহাম্মদ (স:) এর মাধ্যমে আল্লাহ নবুয়্যতের সিলসিলার পরিসমাপ্তি ঘটান। কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ জন্ম নিবে কুরআন ও রাসুল (স:) এর আদর্শ মোতাবেক মুসলমানদের জীবন পরিচালিত হবে। তবে পাপ, পঙ্কিলতা, অন্যায়-অত্যাচার, কুসংস্কারে নিমজ্জিত সমাজ বিনির্মান করতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে আবির্ভূত হবেন আল্লাহ ওয়ালা, পরহেজগার ও রাসুলের প্রকৃত আশেক, আবির্ভূত হবেন পীর, আউলিয়া, বুজর্গ, মুজতাহিদ ও মুজাদ্দিদ। যাঁদের আগমনে এই দুনিয়ায় আল্লাহর দ্বীন সুচারুভাবে প্রজ্জ্বলিত থাকবে।

রাসুল (স:) এর ইন্তেকালের পর মূলত তাঁর সাহাবীগণ এবং তাঁর অনুসারীগণ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ইসলাম প্রচারে ছড়িয়ে পড়েন। এভাবেই ইসলাম সারা বিশ্বে একটি শান্তির ধর্ম হিসেবে প্রসার লাভ করতে থাকে। মুসলমানের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে হিজরি ১৩০০ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে ইসলামের চরম অবনতি পরিলক্ষিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খেলাফতের ধ্বজাধারী তুরস্কের পরাজয়ের পর অটোমান সম্রাজ্য ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং খেলাফতের অবসানের ফলে মুসলমানদের মধ্যে একতার শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ নাস্তিক্যবাদ, জড়বাদ পৃথিবীতে বিকাশ হতে থাকে। ইসলামের তাওহীদি প্রেরণাকে এই অশুভ শক্তি বিপর্যস্ত করে তোলে। ইহুদীরা ইসলামের সাথে নানা ভাবে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করতে থাকে। তাঁরা পৃথিবীতে আবারও মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে পৃথিবীতে অন্ধকার ছড়াতে থাকে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানরত মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও এর প্রভাব থেকে নিস্তার পাননি। ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে মুসলমানরা নানা কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়েছিল। রাসুল (স:) এর মূল আদর্শ থেকে মুসলমানেরা দূরে সরে যায়। বিভিন্ন মতবাদ আবির্ভাব হতে থাকে। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল রাসুলের সীরত এই জামিন থেকে মুছে ফেলার উপক্রম করেছিল। ফলে সমাজের মানুষ ইসলামের আকিদা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ইসলামের এই দুঃসময়ে ধ্বংসে নিমজ্জিত হওয়া সমাজের সংস্কারের জন্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় আবির্ভূত হলেন প্রখ্যাত আলেম, হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ:), শাহ ছাহেব কেবলা, চুনতি।

তিনি একজন আধ্যত্মিক চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। চট্টগ্রামের এই ইতিহাস প্রসিদ্ধ বুজুর্গানে দ্বীন ১৯০৭ সালে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ্ব সৈয়দ আহমদ (রহ.) ও মাতা হাজেরা খাতুন। ৭ বছর বয়সে মা ইন্তেকাল করেন। পরে পিতামহ আলহাজ্ব মুফতি মাওলানা কাজী ইউসুফ (রহ.) এর পরিবারে প্রাথমিক শিক্ষা পেয়ে বেড়ে উঠেন। তিনি পর্যায়ক্রমে চুনতি সামিয়া মাদরাসা, চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম মাদরাসা ও উপমহাদেশের বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলিকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি সবসময় ইলম, আমল, ঈমান ও আল্লাহর এবাদতের প্রতি খুব যত্নবান ছিলেন।

দ্বীনি শিক্ষা লাভের পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের সমাপ্তির পর একবার আকিয়াবে তাঁদের জমিদারী দেখতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি মিয়ানমারের বাম্মু শহরে বেড়াতে যান। সেখানকার মুসলমান অধিবাসীরা তাঁর এলেমে জ্ঞান ও আমলে মুগ্ধ হয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব অর্পন করেন।

কর্মজীবনে শরীয়তের বিধিবিধান মোতাবেক জীবনযাপন, আল্লাহর ইবাদত বান্দেগী করতে করতে সত্যের সন্ধান করতে গিয়ে দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনি পাহাড়-অরণ্যে, শহর-নগরে, গ্রামে-গঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। একসময় তিনি আল্লাহর জিকির আজকার করতে করতে একজন বুজুর্গানে দ্বীন ও আধ্যাত্মিক চিন্তাশীল মানুষে পরিণত হন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন ইসলামের কঠিন সময় যাচ্ছিল তখন তিনি এই জনপদে জন্মগ্রহণ করেন। সমাজের এই দুরবস্থা ও অধঃপতনের দৃশ্য খুব কাছে থেকে তিনি উপলব্ধি করেন। তিনি রাসুলের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেন এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সমাজে মুসলমানদের এই অধঃপতনের পেছনে একমাত্র কারণ আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুলের দেখানো পথ থেকে মুসলমানদের বিচ্যুতি। তিনি এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি কোরআনের শিক্ষা ও মহানবী (স:) এর জীবনাদর্শ অর্থাৎ সীরতুন্নবী (স:) এর প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে অর্থাৎ ১৩৯২ হিজরি ১২ রবিউল আউয়াল “সীরতুন্নবী (স:)” নামে এক ঐতিহাসিক মাহফিলের গোড়াপত্তন করেন। ১২ রবিউল আউয়াল শেষ নবী মুহাম্মদ (স:) পৃথিবীকে আলোকিত করে মা আমেনার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ পাক তাঁকে বিশ্ব রহমত, বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত, বিশ্ব মানবতার এক মহান আদর্শ, মানবের ইহকালিন ও পরকালিন মুক্তি ও নাজাতের পয়গাম হিসেবে প্রেরণ করেন।

রাসুলের জীবনাদর্শ মুসলমানদের একমাত্র অনুসরণযোগ্য মহান আদর্শ। রাসুল (স:) এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সকল ব্যাপারে সকল স্তরে উম্মতের জন্য তিনি রেখে গেছেন সুস্পষ্ট নির্দেশ ও একটি সর্বোত্তম আদর্শ। রাসুল (স:) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার পর পৃথিবীতে আবারো অন্ধকার নেমে এসেছিল। ইসলামের ক্রান্তিলগ্নে যখন মুসলমানেরা রাসুলের আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছিল এমন সময়ে হযরত শাহ ছাহেব কেবলা (রহ.) রাসুলের আদর্শ, কর্ম অর্থাৎ কুরআন, হাদিসের প্রচার ও বিশ্ব ব্যাপি সুন্নতের প্রসার ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই যুগান্তকারী ও কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি ১৩ একর আয়তনবিশিষ্ট সীরত ময়দানে ১৯ দিন ব্যাপি সীরত মাহফিলের গোড়াপত্তন করেন। বিশাল আয়তাকার সীরত ময়দানের পশ্চিম প্রান্তে তাঁর অভিপ্রায় অনুযায়ী নির্মিত হয়েছিল বিশাল একটি জামে মসজিদ “মসজিদে বায়তুল্লাহ”। ১৯৭২ সালে ১ দিনের মাহফিল সূচনা হয়, পরের বছর ১৯৭৩ সালে ২দিন, ১৯৭৪ সালে ৩ দিন, ১৯৭৫ সালে ৫ দিন, ১৯৭৬ সালে ১০ দিন, ১৯৭৭ সালে ১২ দিন এবং সর্বশেষ ১৯৭৯ সালে এই ঐতিহাসিক মাহফিল ১৯ দিনে উন্নীত হয়ে এটি স্থায়ী হয়। তিনি একজন প্রকৃত আলেম, মহান আল্লাহ ও রাসুল (স:) এর প্রকৃত আশেক ছিলেন। তাই তিনি এই মাহফিলের নাম রাসুলের নামের সাথে মিলিয়ে সীরতুন্নবী (স:) নামকরণ করেন। ১৯ দিন ব্যাপী স্থায়ী মাহফিলে সীরতুন্নবী (স:) এর অনুষ্ঠান সূচীর বিষয়াদির পর্যালোচনা করলে মাহফিলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে উঠবে। “সীরত” আরবী শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ চরিত্র, জীবন ব্যবস্থা, জীবনের অবলম্বন, জীবন ব্যাপি ঘটনাবলী ইত্যাদি। বিশ্ব মানবতার শান্তির ও মুক্তির দূত রহমাতুল্লিল আলামীন রাসুলুল্লাহ (স:) এর জন্মলগ্নের কিছু সংক্ষিপ্ত ঘটনাবলীর উপর আলোচনা ছিল এক সময় ঈদে মিলাদুন্নবী (স:)। রাসুলের তেষট্টি বছরের জীবনে, বিশেষ করে নবুয়্যতের তেইশ বছর পৃথিবীতে সত্য ও আলোর সন্ধান দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পর তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। কিন্তু তিনি তাঁর উম্মত অর্থাৎ শেষ জামানার মানুষদের জন্য অমূল্য দু’টি সম্পদ রেখে যান। যার একটি হচ্ছে আল্লাহর পবিত্র কালাম পবিত্র কুরআন মাজিদ ও অপরটি হচ্ছে রাসুলের সুন্নাত। এই মহামূল্যবান দু’টি সম্পদ সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত যে এক বিশেষ নিয়ামত এতে কোনো সন্দেহ নেই।

মাহফিলে সীরতুন্নবী (স:) এর শুরু থেকেই দূর দূরান্ত থেকে আগত মুসলমানের জন্য তাবারুক এর ব্যবস্থা করেন। জেয়াফত সম্পর্কে শাহ ছাহেব কেবলা (রহ.) বলতেন, ওয়াজ শুনে উপবাস থেকে রাতে বৌ-ঝিদের কষ্ট না দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা। গত ৪৭ বছর ধরে (২০১৯ পর্যন্ত) তাঁর প্রবর্তিত এই মাহফিলে সীরতুন্নবী (স:) একইভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশ সেরা আলেমগণ এখানে ওয়ায়েজ করতে আসেন। মাহফিলের সমাপনী অধিবেশনের দিন বিশাল সীরত ময়দানের কানায় কানায় ধর্মপ্রিয় মুসলমান ও তাঁর ভক্তরা জমায়েত হন। মাহফিলের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এতো মানুষের জন্য তাবারুক এর আয়োজন করা হয়। অথচ এত বছরে কখনো মাহফিলের পরিচালনা কমিটিকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ। এটিই তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার প্রমাণ। এ যেন এক অলৌকিক ব্যাপার। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বাজেট নিয়ে মাহফিল পরিচালনা কমিটি মাহফিল শুরু করেন। অথচ কোথায় থেকে যে এই অর্থ যোগান হয় একমাত্র আল্লাহ জানেন।

প্রখ্যাত আলেমগণ বলতেন, “উনি ছিলেন সম-সমায়িক কালের এক বিশিষ্ট মর্যাদাপ্রাপ্ত অলি।” উনার কেরামতের কথা এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। তবে উনার ওফাতের পরও উনার প্রতিষ্ঠিত ১৯ দিন ব্যাপী ঐতিহাসিক মাহফিলে সীরতুন্নবী (স:) আজ-অব্দি যথারীতি চলমান রয়েছে। যা বিশ্বের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রূপে অধিষ্ঠিত।

তথ্যসূত্র: মাহফিলে সীরতুন্নবীর অধিবেশনের আলোচনা সূচী বহি।

About Tamzid20

Check Also

লোহাগাড়ায় স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনারের ইতিকথা

লোহাগাড়া উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নানা পটভূমিতে নির্মিত হয়। ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর লোহাগাড়ায় শহীদ …

পীর আউলিয়ার আবাসভূমি

প্রিয় লোহাগাড়ার কয়েকজন সনামধন্য পীর-আউলিয়ার নাম উল্লেখ করা হলঃ ১। মাওলানা আবদুল হাকিম খান ছিদ্দিকী …

উপজেলার প্রাচীন জনপদঃ

গৌড়স্থানঃ ১৪৩৯ সালে বাংলার সুলতান সদাকত খাঁ নামক সেনাপতির নেতৃত্বে বিশাল গৌড়বাহিনী আরকান রাজ্য পুনঃদখল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *