Home / উন্মুক্ত পাতা / চাঁটগাঁইয়া ভাষার কেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া উচিত?

চাঁটগাঁইয়া ভাষার কেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া উচিত?

চাঁটগাঁইয়া ভাষা নিয়ে লিখছেন- সাঈদ আহসান খালিদ 
রাষ্ট্রভাষা ও মাতৃভাষার পার্থক্যঃ
প্রায়ই দেখা যায়, ‘রাষ্ট্রভাষা’ ও ‘মাতৃভাষা’ -কে অনেকে অভিন্ন ও সমার্থে সংজ্ঞায়িত করে যা সঠিক নয়। এই দুইয়ের তফাৎ জানা ও করা জরুরি। রাষ্ট্রভাষা মানেই সেটি একটি দেশের সব মানুষের মাতৃভাষা নয় আবার কোন দেশের নাগরিকদের সব মাতৃভাষাই যে সেদেশের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়- এমনও নয়। রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে বহুবিধ প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ ও যোগাযোগের জন্য যে ভাষাটি ব্যবহার করে সেটিকে বলা হয়- ‘রাষ্ট্রভাষা’, কোন কোন দেশে সেই ভাষাকে ‘দাপ্তরিক ভাষা’ বা Official Language নামেও অভিহিত করা হয়। তাহলে মাতৃভাষা কোনটি? ড. মাহফুজ পারভেজ বলছেন-
এই ভাষা প্রাকৃতিকভাবে প্রদত্ত এবং জন্মগত…জন্মের সময় যে ভাষাটি তার সংস্কৃতির অংশ থাকে এবং যে ভাষাগত সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পূর্ব-পুরুষগণ বহন করে আনেন, সেটাই নবজাতকের মাতৃভাষা। সাধারণ বিবেচনায় মায়ের মুখের ভাষাটিকেই সন্তানের মাতৃভাষা নামে স্বীকার করা হয়।(ড. মাহফুজ পারভেজ ২০১৮)
মনে রাখতে হবে- রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের ‘মাতৃভাষা’ নয়। আমরা জানি, বাংলাদেশের নাগরিক হিশেবে এ ভূখণ্ডে শুধু বাঙালিই বসবাস করে না; প্রায় ৪৭ টি বা ততোধিক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে যাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজনিজ মাতৃভাষা, রয়েছে সেসব মাতৃভাষাকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র কৃষ্টি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি।
রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’ কীভাবে এদেশে ‘মাতৃভাষা’ বা মায়ের ভাষার সমার্থক হয়ে উঠলো?
এটি মূলত বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভাবাবেগ উৎসারিত একটি প্রবণতা যদিও এটির শেকড় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রোথিত। প্রশান্ত ত্রিপুরার মতে-
‘মাতৃভাষা’ শব্দটির প্রথম দিককার একটি প্রয়োগ হচ্ছে- ১৮৬০ সালে লেখা মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতার একটি চরণ- ‘মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে’। অবশ্য মধুসূদনের আগেই ‘মাতৃভাষা’ শব্দটি অন্যরা ব্যবহার করেছিলেন, গদ্যেঃ যেমন, অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮৪৯ সালে এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫১ সালে।(প্রশান্ত ত্রিপুরা ২০২০: ১০৯)
বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শ্লোগান ও দাবি ছিল- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। যদিও ভাষাসৈনিক আবদুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’- বাক্যটি বাংলাভাষার প্রতি প্রগাঢ় আবেগ এবং ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিশেবে বাংলার স্বীকৃতি না পাওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করছে কিন্তু বাস্তবে ‘রাষ্ট্রভাষা’ মানেই ‘মুখের ভাষা’ বুঝায় না। প্রশান্ত ত্রিপুরা আরো বলছেন-
বরং মুখের ভাষা হল সেই ভাষা, যেটিকে ‘আঞ্চলিক’ বা ‘অশুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে এখনো নিয়মিতই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছ থেকে, তাদেরকে বলা হচ্ছে এমন ভাষা শিক্ষাঙ্গনসহ বিভিন্ন ভদ্রলোকীয় পরিসরের বাইরে রেখে দেওয়ার জন্য!
ঢাকা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট এর অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য লিখছেন-
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের বাংলা বলার অধিকার কেড়ে নিতে চায়নি। তারা বাংলার রাষ্ট্রভাষা হবার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা নয়, রাষ্ট্রভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রতীক। (শিশির ভট্টাচার্য্য ২০১৯)।
রাষ্ট্রভাষা ও মাতৃভাষা যে এক ও অভিন্ন নয় তার আরেকটি প্রমাণ হতে পারে এই , পৃথিবীতে দুই শয়ের মতো রাষ্ট্র আছে কিন্তু ভাষা আছে প্রায় ছয় হাজারের অধিক। সেইসব ভাষা কারো না কারো মাতৃভাষা। একটি ভাষা একাধিক দেশের রাষ্ট্রভাষা হিশেবে থাকতে পারে, উদাহরণস্বরূপ- আরবি, ইংরেজি, স্প্যানিশ প্রভৃতি, তেমনি একটি দেশের মধ্যেই একাধিক ভাষা অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বা দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক ভাষা হিশেবে আইনগত স্বীকৃতি ও মর্যাদা পেতে পারে, যেমন- আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে কোন ‘রাষ্ট্রভাষা’ নেই কিন্তু ভারতের সংবিধানের ৩৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হিন্দি ও ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা (অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ) হিশেবে অন্তর্ভুক্ত করা আছে। ৩৪৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে, ভারতের যে কোন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে উক্ত অঙ্গরাজ্যে প্রচলিত এক বা একাধিক ভাষাকে সেই অঙ্গরাজ্যের অফিসিয়াল ভাষার ঘোষণা দিতে পারে, এমনকি ভারতীয় সংবিধানের ৩৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতের কোন অঙ্গরাজ্যের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক যদি তাদের ‘কথ্য ভাষা’র স্বীকৃতিও দাবি করে তাহলে ভারতের রাষ্ট্রপতি সেই ভাষাকেও উক্ত অঙ্গরাজ্যের অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ হিশেবে স্বীকৃতি প্রদানের নির্দেশ দিতে পারেন। অন্যদিকে কিছু দেশ আছে যেখানে ‘রাষ্ট্রভাষা, জাতীয়ভাষা কিংবা অফিসিয়াল ভাষা’ বলে আলাদা করে কিছু নেই, যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য!
রাষ্ট্রভাষার রাজনৈতিক অর্থনীতিঃ
কোন মাতৃভাষা এবং কার মাতৃভাষাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করা হবে- সেই প্রশ্নটি আগাগোড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। ভাষার সাথে রাজনীতি ও অর্থনীতির সংযোগ গভীর ও সরাসরি। কোন মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুললেই সেটিকে প্রাথমিকভাবে তুমুল রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতা ও দমনমূলক নীতির সম্মুখীন হতে হয়। কারণটি প্রধানত রাজনৈতিক। একাধিক রাষ্ট্রভাষা জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতার পরিপন্থী- এমন একটি ধারণা জাতিরাষ্ট্রে বদ্ধমূল আছে। ভাষার স্বীকৃতির সাথে যেহেতু সেই জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি জড়িত তাই কোন ভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া হলে শাসকগোষ্ঠীর একটি আশংকা থাকে যে সেই ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে স্বায়ত্ত্বশাসন এমনকি স্বাধীনতাও দাবি করতে পারে।
ভাষার স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিকরণের সাথে অর্থনৈতিক প্রশ্নও সরাসরি বিজড়িত। যে জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাটি ইতোমধ্যে রাষ্ট্রভাষা- তারাও রাষ্ট্রভাষার সুযোগ-সুবিধাটুকু ভাগ করতে চায় না, ফলে কোন মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুললে সেটি সামাজিক বিরোধিতার কবলেও পড়ে। আমরা ইংরেজি শিখতে চাই- কারণ ইংরেজি শিখলে ভালো আর্থিক উপার্জনের সুযোগ প্রসারিত হয়, একই কারণে স্প্যানিশ, জার্মান, চীনা কিংবা কোরিয়ান ভাষাশিক্ষায় অনেকে আগ্রহী হয়ে উঠেন। চাঁটগাঁইয়া ভাষার মানুষ, সিলেটি কিংবা চাকমা, গারো, মারমা প্রভৃতি আদিবাসীদের প্রমিত বাংলাভাষা শিখতে হয় কারণ- এই ভাষা জানা ছাড়া শিক্ষা মিলবে না, চাকুরি মিলবে না। অন্যদিকে চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরা চাঁটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলতে পারে না কারণ তাঁদের বাবা-মা মনে করেন, চাঁটগাঁইয়া ভাষা শিখে আর্থিক বা পেশাগত কোন ফায়দা নেই। মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে রাখা হলে ধীরে ধীরে এই ভাষার ব্যবহার হ্রাস পেয়ে একসময় সেই ভাষার মৃত্যু ঘটবে। শিশির ভট্টাচার্য্য বলছেন-
নিছক আবেগ, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে কোনো ভাষাকে বাঁচানো যায় না। একটি ভাষাকে বাঁচাতে হলে সেই ভাষাটিকে কমবেশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সুলতানী ও ব্রিটিশ আমলে বাংলা ভাষার সামাজিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং পাকিস্তানি আমলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশক অতিক্রান্ত হবার পরেও বাংলাভাষা এখনও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা পায়নি। যেহেতু গারো বা মারমার মতো ভাষাগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা নেই সেহেতু ভাষাগুলোর এই মৃত্যুঝুঁকি বাংলার তুলনায় শতগুণ বেশি। পৃথিবীর বহু শত ভাষা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রের ন্যূনতম মনোযোগ পর্যন্ত পায় না পৃথিবীর বহু ভাষা। কোনও ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হবার অর্থ হচ্ছে, ভাষাটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া। এর পরে আসে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন, যার উপর ভাষাটির জীবন-মরণ নির্ভর করবে। (শিশির ভট্টাচার্য্য ২০১৯)।
সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি নিয়ে সমালোচনার যে ভিত্তি, সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি কি সংবিধানে রাষ্ট্রভাষার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আমরা দেখি? দিল্লুর রহমান সংবিধানে রাষ্ট্রভাষার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন-
নির্দিষ্ট একটি ভাষাকে- তা বাংলা, উর্দূ বা ইংরেজিই হোক- যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখন সেই রাষ্ট্রে বাসরত অন্য ভাষা-ভাষী মানুষেরাও তাদের মাতৃভাষার অধিকার ও স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হন। চূড়ান্তভাবে যা রাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদ ছাড়া আর কিছুই উৎপাদন করে না এবং এটি মানবতার চূড়ান্ত অপমান। তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তান সরকার সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে এই বিভেদটাই তৈরি করেছিল এবং আমরা বাঙালি হিসেবে তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেরাই সেই বিভেদকে এখনও জিইয়ে রেখেছি- জেনে বা না জেনে। একটা লড়াকু জাতি হিসেবে এটা স্বীকার করার সৎ সাহস আমাদের থাকা উচিৎ। রাষ্ট্রধর্ম যে অর্থে গণতন্ত্র বিরোধী, রাষ্ট্রভাষা শব্দবন্ধটিও সেই অর্থেই গণতন্ত্র বিরোধী নয় কি? … আধুনিক অনেক রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রভাষার বদলে ‘অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বা ‘দাপ্তরিক ভাষা’ ব্যাবহার করা হয়। সিঙ্গাপুরের অফিসিয়াল ভাষা ৩ টি, ফিনল্যান্ডের ৩ টি, যুক্তরাষ্ট্রের ৭ টি, সুইজারল্যান্ডের ৩ টি- জার্মান, ফরাসী, ইতালীয়। সাবেক বিপ্লবী রাষ্ট্র রাশিয়াতেও অফিসিয়াল ভাষা ছিল ১৬ টি এবং সেখানকার সরকারি দলিলপত্র ১৬ টি ভাষায় প্রকাশিত হত… আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও কোন নির্দিষ্ট রাষ্ট্রভাষা নেই। বরং সেখানে ২২ টি অফিসিয়াল ভাষা সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত। (দিল্লুর রহমান ২০২০)
বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার বিশাল ভাষিক বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে আমাদের সংবিধানের কোথাও ‘মাতৃভাষা’ শব্দটির অস্তিত্বই নেই এবং বাংলাদেশে বাংলা ছাড়া আর কোন দেশি ভাষার প্রচলন রয়েছে- এই সত্যের স্বীকৃতি সংবিধানে অনুপস্থিত। বাংলাদেশের সংবিধান এর অনুচ্ছেদ-৩ বলছে- ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। সংবিধানের এই বিধানকে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে ১৯৮৭ সালে পৃথক আরেকটি আইন প্রণীত হয় যেটির নাম- ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭’ । এই আইন প্রণীত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সবক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য কার্যাবলী লিখিত বাংলায় সম্পাদনের আইনগত বাধ্যবাধ্যকতা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিকাশমান ও বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষাগুলোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে প্রণীত হয়- ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন, ২০১০’ যেটির মাধ্যমে স্থাপিত হয়- ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’অধিকাংশ মানুষের ধারণা হচ্ছে- এই ইনস্টিটিউটের কাজ শুধুই বাংলা ভাষার প্রচার, প্রসার ও বিকাশ করা!
কোন ব্যক্তি কর্তৃক প্রমিত বাংলা বলতে না পারা বা তাঁর বাচনভঙ্গিতে স্বীয় মাতৃভাষার ছাপ থাকাকে বাংলাদেশের বহুলোক মানতে পারে না, সেসব ব্যক্তিরা হরদম কটাক্ষ, উপহাস ও বর্ণবাদী মন্তব্যের স্বীকার হয়। বৈষম্য বিলোপকারী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও আইনগুলোকে সমর্থন করে বাংলাদেশের সংবিধানে সমতা ও বৈষম্যহীনতার অঙ্গীকার সংযুক্ত করা হলেও সেখানে ভাষাগত বৈষম্য বিলোপের বিষয়টি স্থান পায়নি! সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে- ‘ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না’– লেখা থাকলেও ভাষার কারণে কৃত বৈষম্যের কোন উল্লেখ সেখানে নেই! অথচ ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ-২ এ ভাষার কারণে বৈষম্য না করার অঙ্গীকার বিবৃত হয়েছে।
একমাত্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরাই নিজের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রক্ত দিয়েছে, জীবনদান করেছে; পৃথিবীর অন্য কারো এমন নজির নেই। ১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছে, সেটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দাবির সেই আন্দোলন সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে প্রতীকায়িত হয়েছে- মাতৃভাষার সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির আন্দোলনে। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ তারিখকে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিলো সেটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিশেবে; রাষ্ট্রভাষা হিশেবে নয়! ভাষার সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশে যে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটির নাম- ‘আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’; রাষ্ট্রভাষা ইনস্টিটিউট নয়। এই প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতিষ্ঠা নয় বরং বাংলাদেশের সমস্ত জনগোষ্ঠীর নিজনিজ মাতৃভাষাগুলোকে অব্যাহত সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিকাশের মাধ্যমে প্রতিটিকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাবার পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করা। আর বাংলাভাষার প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ‘বাংলা একাডেমি’র কাছে আগে থেকেই ন্যস্ত। একদিকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার সাংবিধানিক ও আইনি একাধিপত্য অন্যদিকে অন্যান্য দেশীয় মাতৃভাষাগুলোকে অস্বীকৃতি ও অবহেলার আর্থ-রাজনৈতিক সংস্কৃতি একুশের ভাষা আন্দোলনের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী নয় কি?
চাঁটগাঁইয়া ভাষা কি একটি স্বতন্ত্র ভাষা? নাকি অশুদ্ধ ভাষা/ উপভাষা/আঞ্চলিক ভাষা ?
চাঁটগাঁইয়া ভাষা চট্টগ্রামের মানুষের কথ্যভাষা, মাতৃভাষা। প্রশান্ত ত্রিপুরা লিখছেন-
অনেকে ভাষা বলতে বোঝেন মূলত লিখিতরূপে চর্চিত ভাষা ও এর ‘প্রমিত’ বা তথাকথিত ‘শুদ্ধ’ রূপকেই। তাঁদের দৃষ্টিতে ভাষার বিভিন্ন কথ্য রূপ, যেগুলি সচরাচর লিখিত আকারে চর্চা করা হয় না, সেগুলি ঠিক ভাষা পদবাচ্য নয়, বরং সেগুলিকে বড়জোর ‘উপভাষা’ বলা যায়। পক্ষান্তরে ভাষাবিজ্ঞানীরা যদি বিশেষ অর্থে উপভাষার ধারণা ব্যবহারও করেন, এটি তাঁরা করেন প্রমিত ভাষাকেও একটি উপভাষা হিসাবে মেনে নিয়ে। এমনিতে তাঁদের কাছে ভাষার কথ্য রূপটাই হল এর প্রধান পরিচয় এবং ‘উপভাষা’ বা ‘অশুদ্ধ ভাষা’ হিসাবে ভাষার কোন রূপকে তাঁরা খাটো বা নাকচ করেন না, কারণ তেমনটি করার পেছনে ভাষাতাত্ত্বিক কোনো যুক্তি নেই। যেমন চট্টগ্রামী বা চট্টগ্রামে ব্যবহৃত ‘আঞ্চলিক বাংলা’কে স্বতন্ত্র বা ‘শুদ্ধ ভাষা’ হিসাবে শিক্ষিত বাংলাদেশিদের অধিকাংশই গণ্য করবেন না, কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে চট্টগ্রামীকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা হিসাবে দেখা হলে তাতে কোনো সমস্যা তো নেইই, বরং সেটিই হবে ‘বৈজ্ঞানিক’। (প্রশান্ত ত্রিপুরা ২০২০: ১০৮-১০৯)
‘উপভাষা’ বা ‘আঞ্চলিকভাষা’ শব্দদ্বারা যদি রাষ্ট্রীয় ভাষার বিপরীতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অন্যান্য ভাষাগুলো যেমন, চাঁটগাঁইয়া, সিলেটি, রংপুরের বা নোয়াখালীর ভাষা কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার অধস্তনতা, অশুদ্ধতা বা নিম্নমান বোঝায়- সেটি যৌক্তিক হবে না এই কারণে, যে বাংলাভাষাকে আমরা বেছে নিয়েছি রাষ্ট্রভাষা বা প্রমিতরূপের ভাষা হিশেবে সেটি নিজেই বৃহত্তর অর্থে ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে পালি ও সংস্কৃত ভাষার খোলস থেকে বেরিয়ে আসা একটি ‘উপভাষা’, ‘ডায়ালেক্ট’ কিংবা ‘আঞ্চলিক ভাষা’। ড. সলিমুল্লাহ খান বলছেন-
কলকাতার মধ্যবিত্ত কবিরা যে বাংলা ভাষার চালু করেছেন…এটাও একটা আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণে এটা তথাকথিত মান ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। এটাও একটা সুন্দর ভাষা। এখান থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। কিন্তু এই কারণে অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার মধ্যে যে সাহিত্যগুণ আছে সেটাকে বাদ দিতে পারি না। এবং বাদ দেওয়ার প্রবণতা হবে আত্মহত্যামূলক। আমি যদি গ্রিক ভাষা কিম্বা ইটালিয়ান ভাষা শিখতে পারি যেমন মধুসূদন শিখেছিলেন, তাহলে আমার উচিত ময়মনসিংহের ভাষা, বরিশালের ভাষা শেখা। কলকাতার ভাষা প্রতিষ্ঠিত ভাষা হয়ে গেছে বলে আর ময়মনসিংহের ভাষায় কোন মনযোগ দেওয়া যাবে না, প্রবণতা হিসাবে এটা হবে কবিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে এমন প্রকাশভঙ্গি আছে যা তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় নেই। (ড. সলিমুল্লাহ খান ২০১০)
চাঁটগাঁ বা সিলেট অঞ্চলে ব্যবহৃত কথ্যভাষা প্রমিত ‘বাংলাভাষা’ থেকে এতোটাই স্বতন্ত্র ও পৃথক যে এসব ভাষা অন্য অঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষের পক্ষে বেশিরভাগক্ষেত্রে অবোধগম্য। এসব অঞ্চলের বহু লোক রয়েছেন বিশেষত গ্রাম অঞ্চলের অনেক নারী- যারা তাঁদের এসব মাতৃভাষা ব্যতীত আর কোন ভাষায় কথা বলতে পারে না, এমনকি প্রমিত বাংলাতেও নয়! তাঁদের ভুকাবুলারিতে বাংলা শব্দ নেই; রয়েছে নিজনিজ মাতৃভাষার শব্দ। ভাষার ভিন্নতা মানেই অধস্তনতা বা অশুদ্ধতা নয়। এক ইংরেজি ভাষারই একাধিক রূপ আছে, যেমন- স্কটিশ ইংলিশ, ব্রিটিশ ইংলিশ, আমেরিকান ইংলিশ, আইরিশ ইংলিশ। মায়ানমারের আরাকানি ভাষার সাথে চাঁটগাঁইয়া ভাষার সাযুজ্য আছে, দেড়শ বছর আগেও অহমিয়া ও উড়িয়া ভাষার সাথে বাংলা ভাষার প্রচুর মিল ছিল। ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এই ভাষাগুলোর গতি ও গন্তব্য বদলে দিয়েছে, অহমিয়া ও উড়িয়া ভাষা বাংলা থেকে ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্যের দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে। কোন ভাষা টিকে থাকবে, মরে যাবে, পরিবর্তিত হবে নাকি পুনর্জন্ম হবে সেটি মোটাদাগে নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষা, অফিস-আদালত, গণ-জীবন ও আইন প্রণয়নে কোন ভাষাটি ব্যবহৃত হচ্ছে অর্থাৎ, ভাষার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতির উপর।
চাঁটগাঁইয়া ভাষার রয়েছে স্বতন্ত্র, উজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য। পৃথিবীর জনপ্রিয় ভাষা গুলোর মধ্যে এটির অবস্থান ৬৯ তম, বিশ্বের ৩ টি দেশের মানুষ চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে- বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমার। বাংলাদেশের ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষের মুখের ভাষা এই চাঁটগাঁইয়া ভাষা এবং এই ভাষার রয়েছে নূর মোহাম্মদ রফিক সম্পাদিত একটি পূর্ণাঙ্গ অভিধান যেটির নাম- ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’। এই অভিধানের ভূমিকায় বলা আছে-
সুলতানি, মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের অনেক আগে সপ্তম শতাব্দী থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আরব বণিকেরা ব্যবসা উপলক্ষে আসা শুরু করে। এর পরে ইউরোপ থেকেও বাণিজ্য সূত্রে জলপথে লোকজন আসতে থাকে…ফলে চট্টগ্রাম শহর তথা বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরবি, ফার্সি, তুর্কি ইত্যাদি ভাষার ব্যাপক প্রভাব পড়ে; এবং এসব ভাষা থেকে আগত শব্দাবলীর অপভ্রংশ রূপ চট্টগ্রামের উপভাষায় ব্যাপকভাবে স্থান পায় এবং সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষার অংশ হয়ে আজো প্রচলিত রয়েছে। (নূর মোহাম্মদ রফিক ২০১৭)
শুধু শব্দগত স্বাতন্ত্র্যই নয়, স্বরভঙ্গির পার্থক্য ও কথার টানের দিক হতেও চাঁটগাঁইয়া ভাষা স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা দাবি করতে পারতে পারে।
বাংলা সাহিত্য ও চাঁটগাঁইয়া ভাষাঃ
কবি প্রণব কুসুম দত্ত রচিত কবিতার দুটো চরণ খেয়াল করি-
তোঁয়াল্লাই বলি আঁর পরাণত হৈছালি ক্যা গরের/
রাইত বিরাইতত ঘুম ন আইয়ের তোঁয়ারে মনত পরের!’
অর্থাৎ, ‘তোমার জন্য আমার মনে এত ছটফট করছে কেন? রাত-বিরাতে ঘুম আসে না- তোমাকে
মনে পড়ে’।
চাঁটগাঁইয়া ভাষায় লেখা এই কবিতায় ব্যবহৃত ‘হৈছালি’ শব্দটি কই মাছের সাথে সম্পর্কিত। কই মাছ কাটার আগে ছাইমেখে শক্ত পাথরে জোরে ঘসে নিয়ে আঁশ ছাড়াতে হয়। তখন কই মাছ যে তীব্র যন্ত্রনায় ছটফট করে সেই অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য চাঁটগাইয়া ভাষায় এই ‘হৈছালি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। প্রেমাষ্পদের বিরহে প্রেমী এমনই ‘হৈছালি’ অনুভব করে! একটি শব্দ দিয়ে এমন চমৎকারভাবে প্রেম আর বিরহ যাতনা প্রকাশ- এটি চাঁটগাঁইয়া ভাষার অনন্য নিজস্বতা, স্বতন্ত্র ঐতিহ্য।
চৌদ্দ থেকে আঠারো শতক পর্যন্ত চট্টগ্রামই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রে। এখানেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা হয়েছে সবচেয়ে বেশি, বাংলা ভাষার আটশ বছরের ইতিহাসে চট্টগ্রাম রাজত্ব করেছে চারশ বছর! বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তাই চাটগাঁইয়া ভাষার কাছে দায়বদ্ধ। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদের পদ রচয়িতাদের অনেকেই ছিলেন চট্টগ্রামের অধিবাসী। ভাষাতত্ত্ববিদগণ স্বীকার করেছেন যে চর্যাপদে চাটগাঁইয়া ভাষার বহু শব্দ স্থান পেয়েছে এবং চর্যাপদের বহু শব্দ এখনো চাটগাঁইয়া ভাষায় আমরা ব্যবহার করে চলেছি! চর্যাপদের সমাজচিত্রতেও দেখা যায় নদী, অরণ্য, পাহাড়, টিলা, সমুদ্র প্রভৃতির বর্ণনা যার সব কিছুই আমরা দেখতে পাই বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রকৃতিতে। চর্যায় আছে হরিণ শিকারের কথা, বন্য হাতির কথা, পাহাড়ি চোলাই মদের প্রসঙ্গ। আছে নৌকা, পাড়, সাঁকো ঘাঁট প্রভৃতির কথা। এই বর্ণনাগুলো চট্টগ্রাম বা পার্বত্য চট্টগ্রামের চিত্রের সাথে মিলে যায়।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের বেশিরভাগ সাহিত্যিক ছিলেন চাটগাঁইয়া। মধ্যযুগের প্রথম মুসলমান কবি হলেন শাহ মুহাম্মদ সগীর। সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যের মধ্যে চট্টগ্রামের অনেকগুলো আঞ্চলিক শব্দ পাওয়া যায়। একইভাবে মধ্যযুগের শ্রীকর নন্দী, দৌলত উজীর বাহরাম খান, সৈয়দ সুলতান, নওয়াজিশ খাঁ, দৌলত কাজী, মরদন, কোরেশী, মাগন ঠাকুর আলাওল প্রমুখ কবিদের জন্মভূমিও এই চাটগাঁ। আরাকান রাজসভার বাংলা সাহিত্যে চাটগাঁইয়া ভাষার প্রভাব একারণেই অনস্বীকার্য। আধুনিক ও উত্তারাধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও চাটগাঁইয়া ভাষা বিপুল প্রভাব রেখে চলেছে। চাঁটগাইয়া পুঁথি, কবিগান, জারিগান, মাইজভাণ্ডারী গীত ও লোকগানের খ্যাতি তো বিশ্বজোড়া। বোয়ালখালী গোমদণ্ডীর বিখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীল এর ‘আমার সাম্পান যাবে উজানে/ কে যাবি রে আয়রে তোরা আঁর হাউসের সাম্পানে’ কিংবা ‘নাতিন বরই খাঁ হাতে লইয়া নুন’ গানগুলো অমর হয়ে আছে। রমেশ শীলের শিষ্য কবিয়াল ফনী বডুয়াও পৃথিবীখ্যাত হয়ে আছেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত গানের একটি- ‘পোয়া কাঁদের ভাতর লাই/ আটা কিনতাম পয়সা নাই’। শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব আর শেফালি ঘোষ জুটির গাওয়া চাটগাঁইয়া গান দেশে- বিদেশে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এই ভাষার মাধুর্য, রস আর প্রাণবন্ততার কারনে। যুগে যুগে বিদেশিরা এসে এই ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছেন, এই ভাষার রূপ, রস, আর সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অনুসন্ধান করেছেন।
উপসংহারঃ
মাতৃভাষা ভাষায় কথা বলতে শেখা একজন মানুষের অধিকার। দু:খের বিষয় চাঁটগাঁইয়া ভাষা আজ নিজ ঘরেই উপেক্ষিত, অচ্ছুৎ। শহুরে শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা তো বটেই চট্টগ্রামের পাড়াগাঁয়ে পর্যন্ত অনেক বাবা-মা সন্তানদের চাঁটগাঁইয়া ভাষা শেখাতে চান না- লজ্জাবোধ করেন, বাচ্চাদের সাথে প্রমিত বাংলায় পরিবারে কথা বলেন। আশপাশ থেকে শুনে বাচ্চারা এক আধটু চাঁটগাঁইয়া ভাষা বলা শুরু করলেই বাপ-মা আর আত্মীয় স্বজন ‘হা রে রে’ করে তেড়ে এসে থামিয়ে দেন- তাদের ধারণা এটি বিকৃত ভাষা, অশুদ্ধ ভাষা, নিচু জাতের ভাষা! নিজের আত্মপরিচয়কে ঘৃণা করা মানে তো নিজের জন্মপরিচয় কে অস্বীকার করা। কবি আবদুল হাকিমের ভাষায়-
‘যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সেসব কাহার জন্মনির্ণয় ন’জানি’
চট্টগ্রামের প্রাণের, ভালবাসার, অহংকারের ও ঐতিহ্যের চাঁটগাঁইয়া ভাষাকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিহীনতার সাথে যদি সামাজিক ও পারিবারিক পরিসরে চাঁটগাঁইয়া ভাষার ব্যবহার এভাবে ম্রিয়মান হতে থাকে- এই ভাষা কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে অচিরেই। পরিবারের সদস্য ও শিশুদের সাথে, বন্ধুদের সাথে চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলুন গর্ব নিয়ে, চাটগাঁইয়া গান ও কবিতা চর্চা করুন, চাটগাঁইয়া ভাষার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিন। আর এটি সর্বোত্তমভাবে সম্ভব হতে পারে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, একটি দেশে একাধিক ভাষার স্বীকৃতি ও প্রচলন ভয়ঙ্কর কোন ব্যাপার তো নয়ই বরং অধিক গণতান্ত্রিক।
তথ্যসূত্রঃ
১। নূর মোহাম্মদ রফিক (২০১৭), চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, বলাকা প্রকাশন (চট্টগ্রাম)
২। প্রশান্ত ত্রিপুরা (২০২০), ঔপনিবেশিকতার ছায়ায় বাংলাদেশ, সংবেদ, ঢাকা।
৩। শিশির ভট্টাচার্য্য, একুশে ফেব্রুয়ারি কেন আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রভাষা দিবস হওয়া উচিত?, bdnews24.com মতামত, জানুয়ারি ২৭, ২০১৯ https://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/55408
৪। ড. মাহফুজ পারভেজ, মাতৃভাষা ও মনের ভাব, banglanews24.com মুক্তমত, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ https://www.banglanews24.com/opinion/news/bd/635835.details
৫। ড. সলিমুল্লাহ খান, বাংলা ভাষা বলে একটি বিশেষ ভাষা নেই, বাংলা বহু ভাষা, bdnews24.com আর্টস, আগস্ট ১৮, ২০১০ https://arts.bdnews24.com/?p=3002
৬। দিল্লুর রহমান, কোন পথে হাঁটছে- রাষ্ট্রভাষা? bangla.report, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০

সহকারী অধ্যাপক
আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।    

About Tamzid20

Check Also

আজ লেখক আহমদ ছফার জন্মদিনঃ হিযবুল্লাহ রায়হান

১৯৪৩ সালের ৩০শে জুন চট্টগ্রামের গাছবাড়িয়ায় প্রত্যন্ত এক গ্রামে ছেলেটির জন্ম। কাঠমিস্ত্রি ও কৃষক বাবার …

লোহাগাড়া উপজেলায় ইটভাটা স্থাপনে মানা হচ্ছে না নিয়ম 

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশ দূষণ রোধকল্পে লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের নোয়ারবিলা এলাকার মানুষের পক্ষে লিখছেন- …

সংস্কৃতির আত্মানুসন্ধানে ১লা বৈশাখের অগ্রযাত্রা

নজরুল ইসলাম তোফাঃ বাংলা পঞ্জিকার ১ম মাস বৈশাখের ১ তারিখেই হয় ‘পয়লা বৈশাখ’ বা ‘পহেলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *